এক ফ্রিকোয়েন্সিতেই কথা বলবে জল-স্থল-বায়ুসেনা! সেনার যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঐতিহাসিক বিপ্লব আনছে DRDO

যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ বদলাতে এবার এক বিরাট ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে চলেছে ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO)। ভারতীয় সেনার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত, আধুনিক এবং ত্রুটিহীন করতে শীঘ্রই সামনে আসছে ‘ইন্ডিয়ান রেডিও সফটওয়্যার আর্কিটেকচার’-এর (IRSA) নতুন সংস্করণ—IRSA 2.0। এর মূল লক্ষ্য হলো—স্থলসেনা, নৌসেনা এবং বায়ুসেনার নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন রেডিও সিস্টেমের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় ও ইন্টারঅপারেবিল্টি বা পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন করা, যাতে যুদ্ধের মাঠে কোনোভাবেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়।
কী এই IRSA 2.0 মিশন?
সেনাবাহিনীর ‘সফটওয়্যার ডিফাইন্ড রেডিও’ (SDR)-র জন্য একটি কমন সফটওয়্যার আর্কিটেকচার স্ট্যান্ডার্ড হলো এই IRSA। সহজ কথায়, এর ফলে বিভিন্ন কোম্পানি বা আলাদা প্ল্যাটফর্মের তৈরি রেডিওগুলোও একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে একে অপরের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পারবে।
ডিআরডিও-র ডিফেন্স ইলেকট্রনিক্স অ্যাপ্লিকেশন ল্যাবরেটরি বা DEAL তিন বাহিনীর সুনির্দিষ্ট চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এটি তৈরি করেছে। এটি গত বছর অক্টোবরে প্রকাশিত হওয়া ‘IRSA 1.0’-এর উন্নত সংস্করণ। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো রেডিওর সফটওয়্যার, ইন্টারফেস, এপিআই (API) এবং বিভিন্ন ওয়েভফর্ম আপডেট করা অত্যন্ত সহজ হবে।
বায়ুসেনা ও নৌসেনার জন্য আসছে নতুন প্রযুক্তির রেডিও
DRDO-র ইলেকট্রনিক কমিউনিকেশন সিস্টেমসের মহাপরিচালক ড. বি কে দাস জানিয়েছেন, ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি সফটওয়্যার ডিফাইন্ড রেডিও তৈরি করা হচ্ছে এবং চলতি বছরের (২০২৬) শেষ নাগাদ এর ওয়েভফর্ম প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বায়ুসেনা রুশ প্রযুক্তির Su-30MKI ফাইটার জেটের মতো কিছু বিদেশি রেডিও সিস্টেম ব্যবহার করলেও, ডিআরডিও-র মূল লক্ষ্য হলো—সেনা যেকোনো দেশের বা কোম্পানির রেডিওই ব্যবহার করুক না কেন, তা যেন অবশ্যই ‘আইআরএসএ স্ট্যান্ডার্ড’ এবং তিন বাহিনীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
পাশাপাশি, ইতিমধ্যেই নৌবাহিনীর জন্য একটি ট্যাকটিক্যাল এসডিআর (Tactical SDR) তৈরি করেছে ডিআরডিও, যা বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে, স্থলসেনার জন্য তৈরি এসডিআর সিস্টেমের ফিল্ড ট্রায়াল বা মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিইএল (BEL)-এর তৈরি এই ম্যানপ্যাক ভ্যারিয়েন্টটি এখন অন্তর্ভুক্তির শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
কেন এই প্রযুক্তি ভারতের সুরক্ষায় গেম চেঞ্জার?
অতীতে বিভিন্ন বাহিনীতে ব্যবহৃত বিদেশি রেডিওগুলো সবসময় একে অপরের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারত না, যার ফলে বড় কোনো যৌথ অপারেশনের সময় সামান্য কমিউনিকেশন গ্যাপ বা যোগাযোগ ব্যবস্থার ত্রুটি বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু নিজস্ব প্রযুক্তির IRSA আর্কিটেকচার চালু হলে ভারত নিজের পছন্দমতো ওয়েভফর্ম, এনক্রিপশন এবং সার্টিফিকেশন স্ট্যান্ডার্ড নিজেই তৈরি করতে পারবে।
এর ফলে বিদেশি ভেন্ডারদের ওপর নির্ভরতা এবং ‘ভেন্ডার লক-ইন’ নামক চিরকালীন ঝুঁকির অবসান ঘটবে। যুদ্ধের সময় বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মতো সংকটজনক পরিস্থিতিতে স্পেয়ার পার্টস, টেকনিক্যাল সাপোর্ট বা আপগ্রেডের জন্য আর ভিনদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না ভারতকে। সব মিলিয়ে, IRSA 2.0 কেবল একটি সাধারণ রেডিও আপগ্রেড নয়, বরং ভারতের তিন বাহিনীকে এক সুতোয় বাঁধার এক অজেয় ও স্বদেশি ডিজিটাল যোগাযোগ কবচ।