“১ ফুটের খুদে পেঙ্গুইনদের রাজত্ব!”-কীভাবে রক্ষা পেল বিশ্বের সবচেয়ে ছোট এই পেঙ্গুইনরা?

অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলের ফিলিপ আইল্যান্ডে (Phillip Island) সূর্য ডুবলেই প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক জাদুকরী ও মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয়। সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি চিরে ছোট ছোট একদল পাখি একে একে ডাঙ্গায় হেঁটে আসে। এরা আর কেউ নয়, পৃথিবীর সবথেকে ক্ষুদ্র প্রজাতির পেঙ্গুইন—যাদের পোশাকি নাম ‘লিটল পেঙ্গুইন’ (Little Penguin) বা ‘ফেয়ারি পেঙ্গুইন’ (Fairy Penguin)। লম্বায় মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার বা এক ফুটের কাছাকাছি এই ছোট্ট পাখিগুলো দেখতে অত্যন্ত সুন্দর ও শান্ত স্বভাবের হলেও, এদের বেঁচে থাকার এই দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাসটি বেশ মর্মান্তিক ও সংগ্রামমুখর।
ধ্বংসের মুখে পড়েছিল যে কারণে
সৌন্দর্যের প্রতীক এই পেঙ্গুইনদের একসময় ফিলিপ আইল্যান্ডে প্রায় ১০টি বড় কলোনি বা বসতি ছিল। কিন্তু মানুষের অবিবেচনাত্মক কার্যকলাপ এবং বহিরাগত প্রাণীদের আক্রমণের মুখে পড়ে এর মধ্যে ৯টি বসতিই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে এই দ্বীপে মানুষের যাতায়াত ও বসতি স্থাপন বাড়তে থাকায় পেঙ্গুইনদের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বাসস্থান মারাত্মকভাবে নষ্ট হতে শুরু করে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন মানুষ নিজেদের সঙ্গে শিয়াল, বিড়াল ও কুকুরের মতো শিকারি প্রাণী দ্বীপে নিয়ে আসে।
হাজার হাজার বছর ধরে ফিলিপ আইল্যান্ডের এই পেঙ্গুইনরা স্থানীয় পরিবেশে বড় হয়ে ওঠায় এমন কোনো হিংস্র শিকারি প্রাণীর মুখ দেখেনি। ফলে শিয়াল বা বিড়ালের মতো খাদকদের আক্রমণ থেকে নিজেদের কীভাবে রক্ষা করতে হয়, তা তাদের জিনগতভাবে জানা ছিল না। যার জেরে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই নিষ্পাপ পাখিগুলোর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করে এবং তারা পাকাপাকিভাবে বিলুপ্তির মুখে গিয়ে দাঁড়ায়।
সংরক্ষণের ঐতিহাসিক লড়াই
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে ১৯৮০-র দশকে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা নড়েচড়ে বসেন। তাঁরা উপলব্ধি করেন, এখনই কঠোর কোনো পদক্ষেপ না নিলে ফিলিপ আইল্যান্ডের এই আকর্ষণীয় পেঙ্গুইনদের চিরতরে হারিয়ে ফেলতে হবে। এর পরেই শুরু হয় অস্ট্রেলিয়ার বন্যপ্রাণী সংরক্ষস ইতিহাসের অন্যতম বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি এক অভিযান।
বিজ্ঞানী ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে এক অভিনব পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পেঙ্গুইনদের নিখুঁত সুরক্ষার জন্য দ্বীপের মূল বসতি এলাকাগুলো থেকে শেয়াল পুরোপুরি নির্মূল করার অভিযান শুরু হয়। একটানা বছরজুড়ে কঠোর নজরদারি ও প্রচেষ্টার ফলেই দ্বীপটিকে শিয়ালমুক্ত করা সম্ভব হয়, যা পরবর্তীতে পেঙ্গুইনদের নিরাপদে ডিম পাড়া ও বাচ্চা লালন-পালনের আদর্শ পরিবেশ ফিরিয়ে দেয়।
শুধু শেয়াল তাড়ানোই নয়, যে সমস্ত অঞ্চলে মানুষ যথেচ্ছ বাড়িঘর তৈরি করে পেঙ্গুইনদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ আটকে দিয়েছিল, সেগুলোকে পুনরায় আগের প্রাকৃতিক রূপ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি সমুদ্র থেকে রাতেরবেলা পেঙ্গুইনদের নিরাপদে কূলে ফিরে আসার পথ সুগম করতে মানুষের যাতায়াত এবং রাতের আলোর ব্যবহারও কঠোর নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে ফেলা হয়।
অবিশ্বাস্য সাফল্য ও বর্তমান চিত্র
কয়েক দশকের একটানা ও ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের পর অবশেষে এসেছে কাঙ্ক্ষিত সেই বিরাট সাফল্য। একসময় যারা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছিল, আজ সেই ফিলিপ আইল্যান্ডের পেঙ্গুইনদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে হাজারে হাজারে। প্রতি বছর শীত-গ্রীষ্ম নির্বিশেষে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমী এই দ্বীপে ভিড় জমান সমুদ্রের বুক থেকে দলবেঁধে উঠে আসা এই খুদে পেঙ্গুইনদের বিশ্ববিখ্যাত ‘পেঙ্গুইন প্যারেড’ বা শোভাযাত্রা চাক্ষুষ করতে।
ফিলিপ আইল্যান্ডের এই অভাবনীয় সাফল্য মানবজাতিকে এক বিরাট বার্তা দেয়। মানুষ চাইলে যে কেবল প্রকৃতির ধ্বংসসাধনই করে তা নয়, বরং খাঁটি সদিচ্ছা এবং সঠিক সুপরিকল্পনা থাকলে বিলুপ্তির মুখে চলে যাওয়া কোনো প্রজাতিকেও প্রকৃতির বুকে পুনরায় সুস্থ ও সুন্দরভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।