আইএএস পদ প্রত্যাখ্যান! ইউপিএসসি-তে অল ইন্ডিয়া ৩১ স্থান পেয়েও দিল্লির মেয়ের অবাক করা সিদ্ধান্ত

ভারতের কঠিনতম পরীক্ষাগুলির মধ্যে অন্যতম ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (UPSC) আয়োজিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা। প্রতি বছর ৯ থেকে ১০ লক্ষ পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষার স্বপ্ন নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত জয়ের মুখ দেখেন মাত্র ৯০০ থেকে ১ হাজার জন। সেই কঠিন ময়দানেই একবার নয়, পর পর চার বার সাফল্য ছিনিয়ে নিয়ে চমক তৈরি করেছেন দিল্লির মেয়ে শ্রেয়া ত্যাগী। তবে আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, সর্বভারতীয় স্তরে ৩১ নম্বর র‍্যাঙ্ক করে দেশের সর্বোচ্চ স্থানাধিকারী ‘আইএএস’ (IAS) ক্যাডার পাওয়ার স্পষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি।

প্রথম থেকে সাফল্যের একের পর এক ধাপ

শ্রেয়া ত্যাগীর এই যাত্রা সহজ ছিল না, বরং তা ধারাবাহিক পরিশ্রমের এক অনন্য উদাহরণ।

  • প্রথম প্রচেষ্টা (২০২১): প্রথম বার ইউপিএসসি সিএসই (UPSC CSE) পরীক্ষায় বসে রিজার্ভ লিস্টে ৪র্থ স্থান অর্জন করেন এবং ইন্ডিয়ান ট্রেড সার্ভিসে (ITS) যোগ দেন।

  • দ্বিতীয় প্রচেষ্টা (২০২২): ৩১৯ তম র‍্যাঙ্ক পেয়ে স্থান পান ইন্ডিয়ান ডিফেন্স অ্যাকাউন্টস সার্ভিস বা আইডিএএস-এ (IDAS)।

  • তৃতীয় প্রচেষ্টা (২০২৩): আরও ভালো ফল করে ১২৩ তম র‍্যাঙ্ক পান এবং ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিস (IRS)-এ নির্বাচিত হন। নাগপুরে আয়কর বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার হিসেবে দায়িত্বও গ্রহণ করেন।

  • চতুর্থ প্রচেষ্টা: অবশেষে চতুর্থ বারে অল ইন্ডিয়া ৩১ নম্বর স্থান অধিকার করেন শ্রেয়া। লিখিত বা মেনস পরীক্ষায় তিনি পেয়েছিলেন ৮০৬ এবং ইন্টারভিউ রাউন্ডে ২০১। মোট ১,০০৭ নম্বর নিয়ে ফলাফলের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি।

কেন IAS বাঝলেন না শ্রেয়া?

৩১ র‍্যাঙ্ক থাকলে যেকোনো পরীক্ষার্থীর কাছে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস বা ‘আইএএস’ হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত থাকে। তবে শ্রেয়া পথ হেঁটেছেন অন্য ধাঁচে। আইএএস-এর মতো প্রভাবশালী পদের সুযোগ পেয়েও তিনি বেছে নিয়েছেন ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস বা ‘আইএফএস’ (IFS)।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে তাঁর শৈশব ও পড়াশোনার ব্যাকগ্রাউন্ড। শ্রেয়ার বাবা স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (SBI) কর্মী হওয়ায় তাঁর ছোটবেলার অনেকটা সময় কেটেছে বাহরাইনে। সেখানে থেকে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণি পাস করার সুবাদে ছোট থেকেই আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বিশ্বের নানা দেশের সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক বিষয় ও কূটনীতির প্রতি টান

দেশে ফিরে এসে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমলা নেহরু কলেজ থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে স্নাতক সম্পন্ন করেন শ্রেয়া। এর পর মর্যাদাপূর্ণ জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU) থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস’ বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি কনফ্লিক্ট ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড পিস বিল্ডিং নিয়েও বিশেষ ডিপ্লোমা করেন তিনি।

শ্রেয়ার কথায়, আইএএস বা আইপিএস দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ হলেও, তাঁর মনের টান ছিল আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার। কূটনৈতিক ক্ষেত্র এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবদান সুনিশ্চিত করতেই তিনি নিজের প্রথম পছন্দ হিসেবে আইএফএস (IFS) ক্যাডার নির্বাচন করেছেন।

ধারাবাহিক টেস্ট সিরিজ, দীর্ঘ ঘণ্টার সুনির্দিষ্ট পাঠ এবং লক্ষ্যের প্রতি অনড় থাকাই যে ৪ বার ইউপিএসসি জয়ের মূল চাবিকাঠি—তা তাঁর এই সাফল্যই প্রমাণ করে দিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *