ব্যাঙ্কে উপচে পড়ছে টাকা! ডলারের দারুণ সাফল্যই ডেকে আনল নতুন বিপদ, এবার কী করবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক?

বিদেশি মুদ্রার আমানত বাড়িয়ে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী করার সরকারি নীতি অত্যন্ত সফল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এবার এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তথা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য বা লিকুইডিটি পৌঁছে গেছে প্রায় ১৪-১৫ লক্ষ কোটি টাকায়। এর ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে টাকার জোগান এবং সুদের হারের উপর নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কেন তৈরি হল এই অতিরিক্ত তারল্য?
গত কয়েক বছরে অনাবাসী ভারতীয়দের বিদেশি মুদ্রায় আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষা মজবুত করার বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর জেরে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক প্রায় ১২৮ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি আমানত সংগ্রহ করেছে, যা প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেকটাই বেশি। এই ডলারের একটি বড় অংশ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে বিনিময় করে ব্যাঙ্কগুলি বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মুদ্রা বা রুপি হাতে পেয়েছে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হলেও, সমান্তরালভাবে সেই রুপির একটি বড় অংশ এখন দেশীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং অতিরিক্ত তারল্যের সৃষ্টি করেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ৭ লক্ষ কোটি টাকা বাজার থেকে শুষে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ৩০ দিনের ভ্যারিয়েবল রেট রিভার্স রেপো পরিচালনা করেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব্যাঙ্কগুলি সেই উদ্যোগে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি এবং মাত্র প্রায় ২.৫৯ লক্ষ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। এর থেকেই স্পষ্ট যে, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় অফুরন্ত টাকা থাকলেও দীর্ঘ সময়ের জন্য সেই টাকা আটকে রাখতে ব্যাঙ্কগুলির তীব্র অনীহা রয়েছে।
সামনে কী কী বিকল্প রয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের?
এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য RBI-এর সামনে সম্ভাব্য অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে ডলার সোয়াপ (Dollar Swap) ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাজারে ডলার বিক্রি করে বিনিময়ে রুপি তুলে নিতে পারে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময়ের শেষে উল্টো লেনদেনের মাধ্যমে সেই ডলার আবার ফেরত নেওয়া হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে বাজার থেকে অতিরিক্ত রুপি শোষণ করা সম্ভব হয়, অথচ এর জন্য নতুন করে সরকারি বন্ড বিক্রি করে বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করতে হয় না।
তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থারও নির্দিষ্ট কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিদেশি মুদ্রার আমানত থেকে জন্ম নেওয়া এই তারল্য যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, তাই স্বল্পমেয়াদি সোয়াপ বারবার ব্যবহার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে সেই টাকা ফের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবেই। দীর্ঘদিন ধরে ১৪-১৫ লক্ষ কোটি টাকার এই উদ্বৃত্ত তারল্য বাজারে টিকে থাকলে তা ঋণের সুদের হার কমিয়ে দিতে পারে, ঋণপ্রবাহে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটাতে পারে এবং দেশের বিভিন্ন সম্পদ বাজারে অতিরিক্ত অর্থ ঢোকার মতো বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সবমিলিয়ে, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী হওয়ার এই সাফল্যের পরই এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই বিপুল উদ্বৃত্ত রুপি কীভাবে সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।