হোরমুজের পর বাব-এল-মান্দেব ‘সীজ’! আগুন জ্বলবে পেট্রোল-ডিজেলের দামে? ভারতে বিরাট সংকটের আশঙ্কা

হোরমুজের পর বাব-এল-মান্দেব জলপথেও ঘনীভূত সংকট: বাড়তে পারে জ্বালানির দাম, আশঙ্কায় ভারত
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের পকেটে পড়তে চলেছে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার তীব্র উত্তেজনার কারণে আগেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘স্ট্রেইট অফ হোরমুজ’ (Strait of Hormuz)। এবার সেই সংকটের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হলো যেমেনের ‘বাব-এল-মান্দেব’ (Bab-el-Mandeb) প্রণালী। এই দুই আন্তর্জাতিক জলপথ একই সাথে প্রভাবিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি যেমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাব-এল-মান্দেব প্রণালীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম (মাইযুন) দ্বীপ পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। ফলে এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী পণ্যবাহী জাহাজের সুরক্ষা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
কেন বাব-এল-মান্দেব এত গুরুত্বপূর্ণ?
মাত্র ৩২ কিলোমিটার চওড়া এই বাব-এল-মান্দেব প্রণালীটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে।
-
বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং ৩০ শতাংশ কনটেইনার ট্রাফিক এই সরু পথ দিয়েই পরিচালিত হয়।
-
এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য ও জ্বালানি নিয়ে যাওয়ার জন্য এটিই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সাশ্রয়ী রুট।
-
২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৮১ লাখ ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছিল।
হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক চাপ
যদিও হুতিরা পুরো জলপথ এখনই পুরোপুরি বন্ধ করেনি, তবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপগুলোতে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। হুতিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরব ব্যতীত অন্য যেকোনো দেশের পণ্যবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবে।
এদিকে, পরিস্থিতি জটিল হতে দেখে সৌদি আরব আমেরিকার কাছে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানালেও ওয়াশিংটন আপাতত তা খারিজ করে দিয়েছে। ফলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
বাণিজ্যের সময় ও খরচ বৃদ্ধিতে বিপাকে বিশ্ব
নিরাপত্তার অভাবে বেশিরভাগ বড় শিপিং সংস্থা এখন লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের পথ এড়িয়ে আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ দিয়ে জাহাজ ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছে।
-
এর ফলে জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত প্রায় ১১,০০০ সামুদ্রিক মাইল ঘুরতে হচ্ছে।
-
একটি যাত্রায় অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৪ দিন বেশি সময় লাগছে, যার ফলে পুরো যাত্রার সময় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ দিন।
-
দীর্ঘ পথের কারণে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা বিশ্ব বাজারে সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইতোমধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম বিশ্ববাজারে ব্যাপরক বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১০৪.৬১ ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি এই দুটি পথই দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ভারতে এই বৈশ্বিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে: ১. জ্বালানি আমদানির চাপ: ভারত তার চাহিদার প্রায় ৮৮-৮৯ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ৬০ শতাংশ এলপিজি (LPG) বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশে পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দর একধাক্কায় অনেকটা বাড়তে পারে। ২. রপ্তানি খাতে ধাক্কা: ভারতের ইউরোপগামী মোট পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই লাল সাগরের এই রুট দিয়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধ, বস্ত্র, রাসায়নিক ও অটোমোবাইল পণ্য। পরিবহন খরচ ও সময় বাড়লে ভারতের বাণিজ্য খাপছাড়া হতে পারে। ৩. ডিজেল রপ্তানিতে প্রভাব: ভারত ইউরোপে বিপুল পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ করে থাকে। আগস্ট মাসেও বাব-এল-মান্দেব দিয়ে ইউরোপে যাওয়া মোট ডিজেলের ৬০ শতাংশ ভারত থেকেই গিয়েছিল। ফলে এই রুটে বাধা তৈরি হলে ভারতের রপ্তানি আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্যের এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই এখন প্রতিটি দেশের সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।