জামাকাপড় আটকাতে গিয়েও খেয়াল করেছেন? সেফটিপিনের পিছনের ওই ছোট গোল ফাঁক কেন থাকে জানেন?

রোজকার জীবনে জামাকাপড় ঠিক রাখা থেকে শুরু করে দরজির কাজ বা নানা জরুরি প্রয়োজনে ‘সেফটিপিন’ আমাদের অত্যন্ত পরিচিত এক নিত্যসঙ্গী। কিন্তু কখনও কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, এই পিনের ঠিক পিছনের দিকে থাকা ছোট গোল ফাঁকটির আসল কাজ কী? অনেকেরই হয়তো ধারণা এটি স্রেফ কোনো ডিজাইনের চমক, কিন্তু এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে দারুণ এক বৈজ্ঞানিক রহস্য ও চমকপ্রদ ইতিহাস।
আবিষ্কারের নেপথ্যে এক অদ্ভুত ঋণশোধের গল্প
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের সূচনা হয়েছিল ১৮৪৯ সালে, আমেরিকান মেকানিক ওয়াল্টার হান্টের হাত ধরে। সেসময় এক বন্ধুর কাছে তাঁর ১৫ ডলারের ঋণ ছিল এবং সেই ঋণ দ্রুত মিটিয়ে ফেলার তাগিদেই তিনি একটি পিতলের তারকে সুকৌশলে বাঁকিয়ে এই কাজের জিনিসটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর তৈরি সেই মেকানিজম বা নকশাই আজ এত বছর পরেও গোটা বিশ্বে রমরমিয়ে চলছে।
‘টরসন স্প্রিং’-এর বৈজ্ঞানিক কারসাজি
বিজ্ঞানের পরিভাষায় সেফটিপিনের ওই পেছনের গোল অংশটিকে বলা হয় ‘টরসন স্প্রিং’ (Torsion Spring)। একটি সাধারণ তারকে মাঝখান থেকে পেঁচিয়ে এই স্প্রিং তৈরি করা হয়, যার ফলে তারের দুই প্রান্তের মধ্যে চমৎকার একটি স্থিতিস্থাপকতা বা ফ্লেক্সিবিলিটি তৈরি হয়। এই মেকানিজমের জন্যই পিনটি এত সহজে দু’আঙুলের সামান্য চাপে খোলা এবং বন্ধ করা সম্ভব হয়।
ওই গোলাকার পেঁচানো অংশটি সেফটিপিনের দুই বাহুর মধ্যে প্রতিনিয়ত একটি শক্তিশালী চাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে। যখন আমরা পিনের মুখটা আটকে দিই, তখন এই স্প্রিংয়ের টেনশনের জন্যই পিনটা ক্যাপের ভেতর একেবারে শক্ত হয়ে আটকে থাকে। আবার ক্লিপ থেকে চাপমুক্ত করলেই ওই একই মেকানিজমের কারণে পিনের ছুঁচলো দিকটা ছিটকে বাইরের দিকে খুলে যায়।
কেন দেওয়া হয় এই গোল লুপ?
ভাবলে অবাক হবেন, ওই গোল লুপটি যদি না থাকত, তবে মাত্র কয়েকবার খোলা ও বন্ধ করার পরই ধাতব তারটি মাঝখান থেকে ভেঙে টুকরো হয়ে যেত। তারটিকে গোল করে পেঁচিয়ে দেওয়ার ফলে ধাতুর উপর পড়া চাপ সমানভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারটির স্থায়িত্ব ও আয়ু কয়েকগুণ বেড়ে যায়। মূলত পিনের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতেই ওয়াল্টার হান্ট এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক নকশার সাহায্য নিয়েছিলেন।
পাশাপাশি, এই স্প্রিংয়ের আরও একটি অসাধারণ গুণ হলো আমাদের শরীরকে নিরাপদ রাখা। পিনটি যখন বন্ধ থাকে, তখন স্প্রিংয়ের চাপের জন্যই এর তীক্ষ্ণ মুখটা সেফটি ক্যাপের মধ্যে সুরক্ষিত থাকে এবং নিজে থেকে খুলে যায় না। এর ফলে জামাকাপড় আচমকা ছিঁড়ে যাওয়ার বা শরীরে ফুটে গিয়ে আঘাত পাওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না। শুধু মেকানিজম নয়, ওই ছোট্ট গোল লুপটি থাকার ফলে সেফটিপিন ধরার ক্ষেত্রে আঙুলের চমৎকার গ্রিপ বা পাকাপোক্ত ধরা তৈরি হয়, যা তাড়াহুড়োর সময় পিনটিকে হাত থেকে পিছলে যেতে দেয় না।
অতএব, পরের বার যখনই সেফটিপিন হাতে নেবেন, এই ছোট্ট সাধারণ বস্তুটির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞান ও ইতিহাসের গল্পটি আপনার নিশ্চয়ই মনে পড়বে।