বাব আল-মন্দেব বন্ধের হুমকি! হূতিদের রুখতে খোদ ইজরায়েলের কাছেও সাহায্য চাইলেন সৌদি যুবরাজ?

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ইয়েমেনের হূতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি এবং পরোক্ষভাবে ইজরায়েলের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। ইসরায়েল হায়োম-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অনুরোধ সরাসরি পারস্য উপসাগরীয় অন্য দেশগুলি এবং মিশরের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, হূতিদের দ্বারা কৌশলগত বাব আল-মন্দেব প্রণালী (Bab el-Mandeb Strait) বন্ধ করা আটকাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) মাধ্যমে ইজরায়েলের সঙ্গেও পরোক্ষ যোগাযোগ করে গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তার আর্জি জানানো হয়েছে।
নিজের বার্তায় সৌদি যুবরাজ সতর্ক করে বলেছেন যে, এই জলপথ অবরুদ্ধ হলে তা কেবল এই অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে। উল্লেখ্য, বাব আল-মন্দেব এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যা এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে এবং সুয়েজ খাল ও ইলাত উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। এই রুট দিয়েই কার্গো জাহাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তেল এবং এলএনজি (LNG) ট্যাঙ্কারগুলি যাতায়াত করে।
তেলের রুট ও বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক সংকট:
ইউরোপে তেল বহনকারী উপসাগরীয় ট্যাঙ্কারগুলি এই প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) তেলবাহী জাহাজও রয়েছে। যুদ্ধের আগের মতো ইউএই তাদের পাইপলাইনের মাধ্যমে ফুজাইরাহ পর্যন্ত ক্রুড অয়েল পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের ট্যাঙ্কারগুলি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে দূর প্রাচ্যের (Far East) উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তবে প্রণালীটি বন্ধ থাকায় সৌদি ট্যাঙ্কারগুলি সংক্ষিপ্ত সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পারছে না। এর জেরে গত কয়েক সপ্তাহে সৌদি আরবকে বাধ্য হয়ে আফ্রিকার চারপাশ ঘুরিয়ে দীর্ঘ পথে তেল পাঠাতে হচ্ছে। দেশটির পক্ষ থেকে সম্প্রতি ঘোষণা করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক হামলার পর তারা পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ স্থগিত রাখছে।
সৌদি শাসকের বার্তায় এই বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে যে, এটি শুধুমাত্র সৌদি আরবের একক যুদ্ধ নয়, বরং এটি এমন একটি সংকট যা সমগ্র বিশ্বকে প্রভাবিত করবে। বাব আল-মন্দেব বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, তা হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ক্ষয়ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি মিশরকেও সতর্ক করা হয়েছে যে, এই রুট অবরুদ্ধ হলে সুয়েজ খালের মাধ্যমে হতে থাকা শিপিং বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা মিশরের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। উপসাগরীয় দেশগুলির কূটনৈতিক আধিকারিকদের মতে, মিশরের রাজধানী কায়রো এই বিষয়ে সৌদি যুবরাজের অবস্থানকে সমর্থন করেছে এবং সাহায্যের জন্য মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে।
সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে নারাজ আমেরিকা:
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই সংঘাতে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপে খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছে না। পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখতে এবং মার্কিন সহায়তা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সেন্টকম (CENTCOM) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে সৌদি আরব পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে সৌদি আরবে ডজনখানেক মার্কিন সামরিক কর্মী অবস্থান করছেন এবং তাঁরা এই অঞ্চলে গোয়েন্দা ও অভিযান সংক্রান্ত বিষয়গুলি সমন্বয় করছেন। তা সত্ত্বেও, উপসাগরীয় কূটনীতিক ও মার্কিন আধিকারিকদের মতে, মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে।
একই সঙ্গে ওয়াশিংটন সেই সমস্ত হূতি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে, যারা সম্প্রতি বাব আল-মন্দেব প্রণালীর কাছাকাছি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে। এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এর মূল শর্ত হবে ওই দখলকৃত অঞ্চলগুলিতে হূতিদের রাডার ও মিসাইল লঞ্চার মোতায়েন করা। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে গাজায় যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই জলপথে জাহাজের ওপর লাগাতার হামলা চালিয়ে আসছে হূতি বিদ্রোহীরা। এর জবাবে আমেরিকা, ইজরায়েল এবং একটি আন্তর্জাতিক জোট এর আগে হূতি ঘাঁটিগুলিতে দীর্ঘস্থায়ী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালেও এই সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা।