মণ্ডপে ঢুকতে গেলে ফুঁ দিতে হবে ব্রেথ অ্যানালাইজারে! পুজোয় এ কী কড়াকড়ি শুরু হলো কলকাতায়?

দুর্গোৎসবের ভিড়ে নিরাপত্তা, শালীনতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কলকাতার বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতি বছরই নানা ধরনের কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এ বছর কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় পুজো—ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া সর্বজনীনের পরিকল্পনা সমস্ত মাত্রা ছাড়িয়ে নজর কেড়েছে। পুজো প্যান্ডেলে ঢোকার আগে দর্শনার্থীরা মদ্যপ অবস্থায় রয়েছেন কি না, তা যাচাই করার জন্য এবার অভিনব ব্যবস্থা নিয়েছে এই পুজো কমিটি। প্রয়োজন সাপেক্ষে ব্যবহার করা হবে ব্রেথ অ্যানালাইজার।
মণ্ডপে ঢুকতে গেলে দিতে হবে ব্রেথ অ্যানালাইজার টেস্ট
চক্রবেড়িয়ার পুজো মণ্ডপ প্রাঙ্গণে ঘোরার সময় যদি কারও আচরণ বা কথাবার্তায় মদ্যপানের সামান্যতম সন্দেহও তৈরি হয়, তবে তাঁকে সরাসরি পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। পরীক্ষার ফল পজিটিভ এলেই সেই ব্যক্তিকে কোনো অবস্থাতেই মণ্ডপে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সম্পূর্ণ পুজো কমিটির নিজস্ব উদ্যোগে এই কড়া বিধি কার্যকর করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, মহাশক্তি অর্চনার এই পবিত্র দিনে মদ বিক্রি বন্ধ রাখার কথা আগেই জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে মহাষ্টমীর ধর্মীয় পরিবেশ, পবিত্রতা ও পুরনো ঐতিহ্য বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “শুদ্ধ পোশাক পরে পবিত্র হয়ে আগে মাকে পুষ্পাঞ্জলি দেব আমরা। ওটাই মহাষ্টমী। এই পরম্পরা ফিরিয়ে আনার কাজ আমাদের সকলকে করতে হবে।” মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে পূর্ণ সম্মান জানাতেই চক্রবেড়িয়ার পুজো উদ্যোক্তারা মণ্ডপে মদ্যপ প্রবেশ রুখতে এই ব্রেথ অ্যানালাইজারের ব্যবস্থা করেছেন। শুধু অষ্টমীর দিনেই নয়, বরং তৃতীয়া থেকেই মণ্ডপ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
কড়া পাহারায় থাকবে প্রবেশপথ
মণ্ডপের প্রবেশপথে থাকবেন পুজো কমিটির বিশ্বস্ত সদস্যবৃন্দ, প্রশাসনের কর্মী এবং বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা। তবে প্রতিটি দর্শনার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে এই পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে না; কেবল কারও চালচলন বা আচরণ দেখে সন্দেহজনক মনে হলেই ব্রেথ অ্যানালাইজারের সাহায্য নেওয়া হবে।
এই বিষয়ে ক্লাবের কার্যনির্বাহী সভাপতি তিমির সরকার জানান, “পুজো মণ্ডপের সামনে আমাদের কমিটির লোকেরা, প্রশাসন ও বেসরকারি নিরাপত্তা রক্ষী থাকবেন। কাউকে দেখে সন্দেহ হলে ব্রেথ অ্যানালাইজারের ব্যবহার করা হবে। ফুঁ দেওয়ার পর সেখানে মদ্যপানের প্রমাণ মিললে তাঁকে কোনোভাবেই প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।” পুজোর দিনগুলোতে কী কী নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে, তার নির্দেশিকা দিয়ে ক্লাবের তরফে নোটিসও সাঁটানো হয়েছে। তিমিরবাবুর সংযোজন, তাঁদের পুজোয় উপচে পড়া ভিড় সামলাতে বর্তমান যন্ত্রের সংখ্যা কম পড়ছে, তাই তারা আরও ১০ থেকে ১২টি নতুন ব্রেথ অ্যানালাইজার কেনার পরিকল্পনা করছেন।
থিমেও থাকছে চমক এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়া
এ বছর চক্রবেড়িয়া সর্বজনীনের পুজোর মূল ভাবনা বা থিম হলো ‘পদ্ম’। ১০৮টি রকমারি পদ্ম ফুল দিয়ে সুসজ্জিত করা হবে আস্ত মণ্ডপটি। আগামী তৃতীয়ার দিন থেকেই তা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার জোর প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে চক্রবেড়িয়ার এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ সামনে আসার পর থেকেই শহরের অন্যান্য পুজো কমিটিগুলোর অন্দরেও শুরু হয়েছে জোর গুঞ্জন। বাকি পুজো উদ্যোক্তারাও কি একই পথে হাঁটবেন? এই প্রসঙ্গে ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’-এর সভাপতি তথা বেহালা নূতন দলের কর্মকর্তা সন্দীপন বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী অষ্টমীর দিন মদের দোকান বন্ধ রাখা হলেও, পুজো কমিটিগুলোকে আলাদা করে কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। ফোরামের সবাই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই প্রাচীন রীতি মেনে পুজো সম্পন্ন করবেন।
অন্যদিকে, হাতিবাগান সর্বজনীনের কর্মকর্তা শাশ্বত বসু এই উদ্যোগের সাধুবাদ জানালেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, হাতিবাগানের মতো বিশাল জনজোয়ারে প্রত্যেককে আটকে ব্রেথ অ্যানালাইজার ব্যবহার করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। তা সত্ত্বেও, চক্রবেড়িয়ার এই নতুন ভাবনা কলকাতার বাকি পুজো উদ্যোক্তাদের চিন্তাভাবনায় কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।