লন্ডনের বুকে বসল বারাণসীর মেজাজ! টেমস নদীর তীরে উপচে পড়ল হাজার হাজার মানুষের ভিড়

হাজার হাজার মানুষের জমায়েতে আলোড়িত হলো সুদূর ইংল্যান্ডের বিখ্যাত টেমস নদীর তীর। এই প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে লন্ডনের মাটিতে আয়োজিত হলো ঐতিহ্যমণ্ডিত গঙ্গা আরতি। যা মূলত আলো এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি অনন্য অনুষ্ঠান। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে গত রবিবার টেমসের তীরে সমবেত হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ।
‘টোটালি টেমস’ উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ
ইংল্যান্ডের চিন্ময় মিশনের (Chinmaya Mission UK) উদ্যোগে এবং বার্ষিক ‘টোটালি টেমস’ (Totally Thames) উৎসবের সহযোগিতায় এই জমকালো ‘টেমস নদীতে গঙ্গা আরতি: আলোর উৎসব’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী চিন্ময় মিশনের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপনের অঙ্গ হিসেবে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ভারতের পবিত্র গঙ্গা নদীর তীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিখ্যাত আরতির আদলেই লন্ডনের এই আয়োজনকে প্রকৃতি, জ্ঞান ও চেতনার এক অবিরাম জীবনপ্রবাহের প্রতীক হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের চিন্ময় মিশনের আবাসিক শিক্ষিকা ব্রহ্মচারিণী শ্রীপ্রিয়া চৈতন্য বলেন, “প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ গঙ্গার তীরে সমবেত হয়ে নদী, প্রকৃতি এবং জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রদীপ নিবেদন করে আসছে। টেমস নদীর তীরে আয়োজিত এই গঙ্গা আরতি সেই একই চেতনাকে বহন করে এবং কৃতজ্ঞতা, আশা ও ঐক্যের এক যৌথ মুহূর্তে মানুষকে একত্রিত করেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী চিন্ময়ানন্দ তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বেদান্তের চিরন্তন জ্ঞানকে হিমালয় থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিয়ে আসার জন্য। চিন্ময় মিশনের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপনের এই অনুষ্ঠানটি সেই ঐতিহ্যেরই এক সার্থক উদযাপন।”
পরিবেশ সচেতনতার অনন্য দৃষ্টান্ত
হিন্দু সনাতন ঐতিহ্যে গঙ্গা আরতি হলো মূলত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম, যাতে বড় আকারের বহু-স্তরের প্রদীপ, প্রার্থনা, সঙ্গীত ও মন্ত্রোচ্চারণ অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে বিদেশের মাটিতে এই আয়োজন করার সময় পরিবেশের সুরক্ষার কথা সম্পূর্ণ মাথায় রাখা হয়েছিল।
চিন্ময় মিশনের মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, টেমস নদীর তীরে আয়োজিত এই আরতি সম্পূর্ণভাবে স্থলভাগেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জল যাতে কোনোভাবেই দূষিত না হয়, তার জন্য অনুষ্ঠানের কোনো কিছুই টেমস নদীতে ফেলা বা বিসর্জন দেওয়া হয়নি। প্রথাগত প্রদীপগুলো জলে ভাসানোর পরিবর্তে নদীর তীরেই সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
গ্রিনিচে জমজমাট সাংস্কৃতিক সমাগম
গ্রিনিচের ঐতিহাসিক ‘ওল্ড রয়্যাল নেভাল কলেজ’-এর মনোরম পটভূমিতে মন্ত্রোচ্চারণ ও ভক্তিগীতি সহযোগে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত হিন্দু সংগঠন, সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং প্রবীণ আধ্যাত্মিক নেতারা এই মহা উৎসবে একত্রিত হন। ব্রিটিশ হিন্দু ও দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সব পটভূমির মানুষকে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এই মঞ্চ একজোট করেছিল।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সাল থেকে চলে আসা ‘টোটালি টেমস’ উৎসবের এ বছরের এই গঙ্গা আরতি অনুষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল এবং এর সমস্ত টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পর আয়োজকদের আশা, ভবিষ্যতে এটি লন্ডনের বার্ষিক সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের একটি নিয়মিত ও আকর্ষক আয়োজনে পরিণত হবে।