‘পাখণ্ডি’ ও ‘পাষণ্ড’ আসলে কারা? বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের মাঝেই লুকিয়ে কোন ভয়ঙ্কর ঐতিহাসিক সত্যি?

বাঙালির দুর্গোৎসবের মরশুমে আমিষ খাওয়া নিয়ে বাগেশ্বর বাবা বা ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধেছে। পুজোর দিনে যাঁরা আমিষ আহার গ্রহণ করেন, তাঁদের ‘পাখণ্ডি’ বা ভণ্ড বলে তোপ দেগেছেন এই ধর্মগুরু। আর এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, ঠিক কী এই ‘পাখণ্ডি’ শব্দের অর্থ? ইতিহাস ও শাস্ত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, এই শব্দের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ‘পাষণ্ড’ শব্দটি। কিন্তু প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র বা দর্শন অনুসারে ঠিক কাকে ‘পাষণ্ড’ বলা হতো?

বিশিষ্ট গবেষক ও শাস্ত্রজ্ঞদের মতে, প্রাচীন ভারতে মূলত নাস্তিকদের চিহ্নিত করতেই ‘পাষণ্ড’, ‘পাষণ্ডী’ বা ‘পাষণ্ডিক’ শব্দের ব্যবহার করা হতো। বিষ্ণুপুরাণেও এই শব্দের বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। তবে আজকের আধুনিক যুগের ‘এথেইস্ট’ বা নাস্তিক ধারণার সঙ্গে প্রাচীন ভারতের নাস্তিকতার কোনো মিল নেই। দার্শনিক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্রের গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রাচীনকালে মূলত বৌদ্ধ, জৈন, আজীবিক ও চার্বাকদের মতো গোষ্ঠীগুলিকে নাস্তিক হিসেবে দেখা হতো।

ইতিহাস বলছে, সেকালের বৌদ্ধ বা জৈনরা বেদের প্রামাণ্যতা কিংবা ঈশ্বরকে স্বীকার না করলেও জন্মান্তর, কর্মফল, নরক কিংবা দেবদেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখতেন। আস্তিক্যপন্থীরা তাঁদের নাস্তিক বা পাষণ্ড বললেও সমাজে তাঁদের প্রভাব ও প্রতাপ নেহাত কম ছিল না। এমনকি ষোড়শ শতকের নবদ্বীপের পণ্ডিত মধুসূদন সরস্বতী তাঁর ‘প্রস্থানভেদ’ গ্রন্থে নাস্তিক্য মতকে ‘ম্লেচ্ছ’ দর্শনের সমতুল্য বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, বৌদ্ধ বা জৈন সাহিত্যেও আস্তিক্যপন্থীদের ‘পাখণ্ডী’ হিসেবে চিহ্নিত করার নজির রয়েছে। সুতরাং, সময়ের পরিবর্তনে একই শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ কীভাবে বদলে গেছে, বর্তমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের জেরে সেই ইতিহাসই এখন নতুন করে সামনে চলে আসছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *