‘পাখন্ডী’ শব্দের আসল অর্থ জানেন? প্রাচীনকালে এর মানে শুনলে চমকে যাবেন!

টিভি সিরিয়াল বা সিনেমার সংলাপ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কথাবার্তায় ‘পাখন্ডী’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শঠ, ভণ্ড, প্রতারক কিংবা ছদ্মবেশী মানুষদের চিহ্নিত করতেই এই শব্দটি আকছার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মুখের মুখে ফেরা এই জনপ্রিয় শব্দটির আসল উৎপত্তি কোথায় এবং সময়ের সঙ্গে কীভাবে এর অর্থ সম্পূর্ণ বদলে গেল, তা অনেকেরই অজানা।
আভিধানিক অর্থে ‘পাখন্ডী’ বা ‘পাষণ্ডী’ বলতে এমন একজন ব্যক্তিকে বোঝায়, যার মুখের কথার সঙ্গে অন্তরের আচরণের কোনো মিল নেই। অর্থাৎ, যিনি ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজের ফায়দা তোলে বা ভণ্ডামি করে। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, এই শব্দটি মূলত তৎসম শব্দ ‘পাষণ্ড’ থেকে উদ্ভূত। সংস্কৃত ‘পাষণ্ড’ প্রাকৃত ভাষায় ‘পাসণ্ড’ রূপ নেওয়ার পর হিন্দি ও বাংলার হাত ধরে আজকের ‘পাখন্ডী’ শব্দটিতে এসে ঠেকেছে।
তবে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোখ রাখলে অবাক হতে হয়। গোড়ার দিকে ‘পাষণ্ড’ বা ‘পাসণ্ড’ শব্দটির কোনো নেতিবাচক অর্থ বা গালির রূপ ছিল না। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে ‘পাসণ্ড’ শব্দটির ব্যবহার মিলেছে, যেখানে এটি মূলত ‘ধর্মীয় সম্প্রদায়’ বা নির্দিষ্ট কোনো ‘পন্থ’ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। সেই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মমত বা সম্প্রদায়কে আলাদা করতে এই শব্দের প্রচলন ছিল।
পরবর্তীতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দের অর্থে বড়সড় পরিবর্তন আসে। বৈদিক সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যখন বেদবিরোধী বা ভিন্নমতের সম্প্রদায়গুলোকে (যেমন বৌদ্ধ, জৈন কিংবা চার্বাক দর্শন) ‘ধর্মদ্রোহী’ হিসেবে দেখা শুরু করেন, তখন থেকেই ‘পাষণ্ড’ শব্দটিতে নেতিবাচক আভা জুড়তে শুরু করে। এরপর মধ্যযুগের কালপরিক্রমায় ধর্মের নামে ভণ্ডামি বা সাধুর মুখোশ পরে অপরাধ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় শব্দটি পুরোপুরি প্রতারক ও ছদ্মবেশীদের সমার্থক হয়ে ওঠে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ইতিহাস বা ভাষার গভীরে না গিয়ে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই ভণ্ড বা প্রতারকদের বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করেন। সময়ের হাত ধরে ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ‘পাখন্ডী’ আজ সামগ্রিক নৈতিক অবক্ষয় ও প্রতারণার এক অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে।