মধ্যপ্রদেশে চরম মানবিক বিপর্যয়! হাসপাতালের বদলে কাদার ডেলায় প্রসব, ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা গ্রাম

মধ্যপ্রদেশের জবলপুর থেকে এক হৃদয়বিদারক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। উন্নয়নের শত প্রতিশ্রুতির ভিড়ে দুর্গানগর গ্রামের বাসিন্দাদের ভাগ্যে জুটেছে চরম বঞ্চনা আর নরকযন্ত্রণা। পাকা রাস্তা না থাকায় কাদামাখা পথেই সন্তানের জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছেন এক প্রসূতি। আর প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত হয়ে এবার নিজেদের হাতেই কোদাল-টাঙ্গি তুলে নিয়েছেন গ্রামবাসীরা।
কী ঘটেছিল সেদিন?
জবলপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে শাহপুরা ব্লকের চিরাপোড়ী গ্রাম পঞ্চায়েতের দুর্গানগর গ্রামের ঘটনা। ৩৫ বছর আগে বরगी বাঁধ প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ হওয়া এই আদিবাসী গ্রামটি আজও মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সরকারি খাতায় ‘পূর্ণ গ্রাম’-এর মর্যাদা না পাওয়ায় এখানে জুটেনি কোনো পাকা রাস্তা।
রামকলী বাই নামের এক গর্ভবতী নারীর প্রসব বেদনা উঠলে শুরু হয় আসল লড়াই। বর্ষার জলে গ্রামের দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার রাস্তা ততক্ষণে গভীর কাদার ডেলায় পরিণত হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স তো দূরঅস্ত, হেঁটে চলাও অসম্ভব ছিল। বাধ্য হয়ে পরিবার তাঁকে খাটিয়ায় বা পায়ে হেঁটে কাদা রাস্তা পার করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই খোলা আকাশের নিচে, কাদার মাঝেই প্রসব করতে বাধ্য হন রামকলী। সৌভাগ্যবশত মা ও নবজাতক সুস্থ থাকলেও এই অমানবিক ঘটনা পুরো গ্রামের বিবেককে নাড়া দেয়।
প্রশাসনের কর্তাদের মন গলল না, রুখে দাঁড়াল গ্রাম
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসনের দরজায় কড়া নেড়েও কোনো সুরাহা মেলেনি। বন বিভাগ ও প্রশাসনের একঘেয়ে রুটিন জবাব—”এটি তো কেবল একটি টোলা মাত্র!”
প্রশাসনের ওপর ভরসা হারিয়ে অবশেষে নিজেরাই ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন গ্রামবাসীরা। বর্তমানে রামকলীর সেই বেদনাকে শক্তিতে পরিণত করে গ্রামের প্রায় ১০০ জনের বেশি নারী, পুরুষ ও শিশুরা হাতে ফভাড়া ও তসল নিয়ে ২ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণে নেমে পড়েছেন। নিজেদের ব্যক্তিগত খরচে ও অনুদানে পাথর আর মোরাম ফেলে অন্তত চলাচলের উপযুক্ত পথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁরা।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বেহাল দশা
গ্রামটিতে শুধু যাতায়াত নয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবাও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এলাকার একমাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়টির ভবন জर्जर হওয়ায় এক ছোট কক্ষেই চলছে স্কুল এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। বর্ষার দিনে জল জমে রাস্তা কাদা হয়ে যাওয়ায় পড়ুয়ারা স্কুলে পৌঁছাতে পারে না। অন্যদিকে, গর্ভবতী মহিলাদের প্রসবের জন্য ডেলিভারির ১৫ দিন আগেই অন্য গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়। এছাড়া গ্রামের তরুণ-তরুণীদের বিয়েতেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অনুন্নত সড়ক ব্যবস্থা।
কী বলছেন জনপ্রতিনিধি ও কর্তারা?
স্থানীয় বিধায়ক নীরজ সিংয়ের দাবি, দুর্গানগর একটি বনগ্রাম হওয়ায় সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়মের বেড়াজাল রয়েছে। এর জন্য বন বিভাগ বা বিশেষ তহবিলের প্রয়োজন। তবে গ্রামবাসীদের এই জনভাগীদারী প্রচেষ্টাকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত রাস্তাটি চলাচলের যোগ্য করে তোলার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, জেলা পঞ্চায়েত সিইও অভিষেক গেহলৌত জানিয়েছেন বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে এবং নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত কোনো বিকল্প উপায়ে রাস্তাটি গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হবে।
প্রশাসনের এই প্রতিশ্রুতির পর আদৌ কি দুর্গানগরবাসীর কপাল বদলাবে, নাকি বঞ্চনার অন্ধকারেই কাটবে তাদের দিন? সেটাই এখন দেখার বিষয়।