নজর দোষ আসলে কী? কোথা থেকেই বা এল এই প্রাচীন ধারণা এবং এর থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী?

আমাদের সমাজে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল যিনি জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে ‘নজর লাগা’ বা ‘ইভিল আই’ (Evil Eye)-এর কথা শোনেননি। বিশেষ করে ছোট বাচ্চারা হঠাৎ কান্নাকাটি শুরু করলে কিংবা কোনো সুস্থ মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রবীণদের মুখে প্রায়শই শোনা যায়—”কাদের যেন নজর লেগেছে!” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নজর দোষ বা কুনজর আসলে কী? এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা আর কোন সুদূর অতীত থেকে মানব সমাজে এই ধারণার উৎপত্তি হয়েছে? আসুন জেনে নেওয়া যাক।
নজর দোষের ধারণাটি এল কোথা থেকে?
ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ‘নজর লাগা’ বা কুনজরের ইতিহাস হাজার হাজার বছর পুরনো। প্রাচীন গ্রীক, রোমান এবং মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাতেও এই বিশ্বাসের সন্ধান মেলে। মানুষের তীব্র হিংসে, গোপন ঈর্ষা কিংবা অতিরিক্ত প্রশংসার দৃষ্টি থেকে কোনো ভালো জিনিস বা ব্যক্তির ক্ষতি হতে পারে—এই ভাবনা থেকেই মূলত নজর দোষের ধারণার জন্ম। বহু সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হতো যে, কারো মনে থাকা নেতিবাচক শক্তি চোখের চাহনির মাধ্যমে অন্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞান কি নজর দোষে বিশ্বাস করে?
আধুনিক বিজ্ঞান সরাসরি ভূত-প্রেত বা অতিপ্রাকৃত নজর দোষের তত্ত্বে বিশ্বাস না করলেও এর মনস্তাত্ত্বিক দিকটিকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের অতিরিক্ত কৌতূহল বা নেতিবাচক মনোভাব অনেক সময় চারপাশের পরিবেশে এক ধরনের মানসিক চাপ বা অস্বস্তির সৃষ্টি করে। এছাড়া অনেক সময় কোনো দুর্ঘটনা বা অসুস্থতাকে নিজের অজান্তেই একটি অদৃশ্য শক্তির ওপর চাপিয়ে দিয়ে মানসিক শান্তি পাওয়ার প্রবণতাও এর পেছনে কাজ করে।
নজর দোষ থেকে বাঁচার উপায় কী?
সমাজ ও সংস্কৃতির নানা স্তরে নজর দোষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রচলিত টোটকা বা প্রথার প্রচলন রয়েছে:
কালো টিকা বা সুরমা: বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের কপালে বা কানের পেছনে কালো টিকা দেওয়ার প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, যা মূলত নজর কাটানোর প্রতীকী উপায় হিসেবে মানা হয়।
লঙ্কা ও নুন পোড়ানো: গ্রামবাংলায় আজও কারো নজর লাগলে লঙ্কা ও নুন পুড়িয়ে সেই নেতিবাচক শক্তি দূর করার লোকায়ত বিশ্বাস রয়েছে।
মানসিক শক্তি ও পজিটিভিটি: অতিরিক্ত মানুষের ভিড় বা অতিরিক্ত প্রশংসা থেকে নিজেকে সংযত রাখা এবং ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখাই জীবনের বড় সুরক্ষা কবচ।
পরিশেষে বলা যায়, নজর দোষ বা ইভিল আই অনেকাংশেই অন্ধবিশ্বাস ও মানসিক ধারণার ওপর নির্ভরশীল হলেও, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি মানুষের লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।
(ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র সাধারণ সচেতনতা, লোকসংস্কৃতি ও তথ্যের উদ্দেশ্যে পরিবেশিত। এ বিষয়ে অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারের বশে কোনো চরম পদক্ষেপ না নিয়ে যুক্তিবাদী মনোভাব বজায় রাখাই শ্রেয়।)