৮ বছর পর ভারতে পা রাখলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট! ব্রিকস সামিটে এসেই আমেরিকাকে কোন বড় বার্তা দিলেন মাসুদ পেজেশকিয়ান?

ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে এসে পৌঁছেছেন ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান। দীর্ঘ আট বছর পর এই প্রথম ইরানের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান ভারত সফরে এলেন, এর আগে ২০১৮ সালে হাসান রুহানি ভারত সফরে এসেছিলেন। আজ সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। তবে দিল্লি রওনা হওয়ার আগেই বিশ্ব রাজনীতিতে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তিকে এক হাত নিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। ব্রিকসের মঞ্চে একরফা আধিপত্য বা ইউনিটেরিয়ালিজম (Unilateralism)-এর বিরুদ্ধে লড়াই এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর জোরালো ডাক দিয়েছেন তিনি।

ডলারে নয়, নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের হুংকার
তেহরান ত্যাগের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস গোষ্ঠী সদস্য দেশগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বহুমুখিতাকে শক্তিশালী করার এক বিরাট সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে ব্রিকস জোটে ১১টি মূল সদস্য এবং ১০টি নতুন দেশ (যাদের ‘ব্রিকস প্লাস’ বলা হয়) নিয়ে মোট ২১টি দেশ রয়েছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ এবং প্রায় ৩৫ শতাংশ ভূ-ভাগের প্রতিনিধিত্ব করে এই প্রভাবশালী ব্লক।

পেজেশকিয়ানের মতে, এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মার্কিন একরফা আধিপত্যবাদের শক্ত मुकाबला করা। সদস্য দেশগুলির আর্থিক লেনদেনে আমেরিকার মুদ্রার (ডলার) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব বা স্থানীয় মুদ্রায় ব্যবসা চালানোর নতুন পথ তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বড় শক্তিগুলির অতিরিক্ত চাপ ও অর্থনৈতিক দমনপীড়ন থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

মোদি-পেজেশকিয়ান বৈঠকে কোন কোন বিষয় থাকবে ফোকাসে?
ব্রিকস সামিটের পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রপতির দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বেশ কিছু কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ইস্যু প্রধান হয়ে উঠতে পারে:

চাবাহার বন্দর প্রকল্প (Chabahar Port): পাকিস্তানের ভূখণ্ডকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য ভারতের কাছে চাবাহার বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহিদ বেহেশতি টার্মিনাল পরিচালনা এবং একে উত্তর-দক্ষিণ আন্তর্জাতিক পরিবহন করিডোর (INSTC)-এর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে বড় অগ্রগতি হতে পারে।

জ্বালানি ও তেল সরবরাহ (Oil & LPG): ভারতকে আরও বেশি পরিমাণে কাঁচা তেল এবং এলপিজি (LPG) সরবরাহ করতে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইরান। ভারতের জ্বালানি সুরক্ষা এবং বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত বড় পদক্ষেপ হতে পারে, যদিও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর।

আঞ্চলিক ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট: দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসার এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্র বাণিজ্যের স্বাধীনতা এবং পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত ও ইরানের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠক আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোনো বড় মেগা ডিলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *