অন্নপূর্ণা যোজনায় ভুরি ভুরি নাম বাদ! নেপথ্যে কি ভোটকুশলী সংস্থার ‘গেমপ্ল্যান’? বিস্ফোরক তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে

অন্নপূর্ণা যোজনায় যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বহু মহিলার নাম বাদ পড়ার নেপথ্যে কি কোনো ভোটকুশলী সংস্থার চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বড় ধরনের কারচুপি ছিল? এই চাঞ্চল্যকর প্রশ্নটিই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তকারীদের মনে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে নিযুক্ত ওই সংস্থার একাংশের বিরুদ্ধে যাচাই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও গলদের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এই সংক্রান্ত বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসায় শোরগোল পড়ে গেছে প্রশাসনিক মহলে।
ভোটকুশলী সংস্থার ডেটাবেস বনাম সরকারি নথি
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, তৃণমূল জমানার শেষভাগে বিভিন্ন সরকারি দফতর ও প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে ওই ভোটকুশলী সংস্থার কর্মীরা নিয়োগ পেয়েছিলেন। গ্রামীণ এলাকার পঞ্চায়েত, বিডিও অফিস থেকে শুরু করে শহরের একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁরা দাপটের সঙ্গে কাজ করতেন। অভিযোগ, সেই সুবাদেই জনপ্রিয় প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর উপভোক্তাদের একটি বিশাল ডেটাবেস ওই সংস্থার নাগালের মধ্যে চলে আসে। পরবর্তীতে অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদন যাচাইয়ের সময় সরকারি নথিপত্রের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় সেই বেসরকারি ডেটাবেসকে। ফলে, ওই নির্দিষ্ট তালিকায় নাম না থাকায় বহু যোগ্য মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিরোধী প্রভাবিত এলাকায় বঞ্চনার অভিযোগ
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তৃণমূল-অধ্যুষিত এলাকার মহিলারা নির্বিঘ্নে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পেলেও বিরোধী-প্রভাবিত এলাকার বহু আবেদনকারী সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অভিযোগ, পুরোনো সেই পক্ষপাতদুষ্ট ডেটাবেসের ভিত্তিতেই অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদন যাচাই করা হয়েছিল। নতুন সরকার প্রকল্পের টাকা বিতরণের জন্য নথিপত্র যাচাই শুরু করলে, সেখানেও ওই সংস্থার চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা যুক্ত হন। সরকারি নথিতে আবেদনকারীর যোগ্যতা স্পষ্ট প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও, ডেটাবেসে নাম না থাকার অজুহাতে বহু মানুষের আবেদন বাতিল বা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
বিক্ষোভের নেপথ্যেও কি উসকানি?
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ায় সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ক্ষোভ ও বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। কোথাও কোথাও রেললাইন অবরোধের মতো চরম পরিস্থিতিও তৈরি হয়। এই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের আড়ালে ওই ভোটকুশলী সংস্থার কর্মীদের একাংশের কোনো রাজনৈতিক উসকানি ছিল কি না, তা নিয়েও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। যোগ্য মহিলারা কেন প্রকল্পের বাইরে রইলেন এবং সরকারকে ইচ্ছাকৃতভাবে বেকায়দায় ফেলার কোনো পরিকল্পনা হয়েছিল কি না, গোয়েন্দারা সেই জট খোলারও চেষ্টা করছেন।
সরকারি ডেটাবেস কীভাবে গেল বেসরকারি সংস্থার হাতে?
তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার পরই অন্নপূর্ণা যোজনার যাচাই প্রক্রিয়া থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মীদের জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে খবর। একই সঙ্গে, তাঁদের কাছে থাকা সেই বিতর্কিত ডেটাবেসও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ও সংবেদনশীল প্রশ্নটি হলো—একটি সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তাদের অতি গোপনীয় ডেটাবেস কীভাবে কোনো বেসরকারি ভোটকুশলী সংস্থার হাতে পৌঁছাল? এই তথ্যের অপব্যবহার করে ঠিক কী ফায়দা তোলার চেষ্টা হয়েছিল, তা নিয়ে এখন আলাদাভাবে কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছেন তদন্তকারীরা।