দিল্লিতে বসছে ব্রিকসের মেগা আসর, মোদি-পুতিন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নজিরবিহীন মোড় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে

আজ ও আগামীকাল নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উদীয়মান অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলির এই মেগা ইভেন্টের আয়োজক দেশ হিসেবে বড় ভূমিকা পালন করছে ভারত। চলতি বছর ব্রিকসের সভাপতিত্ব হাতে নিয়ে বাণিজ্য, পেমেন্ট ব্যবস্থা, প্রযুক্তি এবং উন্নয়নমূলক সহযোগিতায় আমূল পরিবর্তন আনতে চাইছে নয়াদিল্লি। ব্রিকস তার মূল পাঁচ সদস্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বর্তমানে আরও বিস্তৃত হওয়ায় গ্লোবাল অর্থনৈতিক আলোচনায় ভারতের এই নেতৃত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্মেলনের ঠিক আগে আজ শুক্রবার নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রে মোদির সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত ৩১ অগাস্ট বিশকেকে এসসিও শীর্ষসম্মেলনের ফাঁকে পুতিনকে এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মোদি। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ জানিয়েছেন, আজকের এই বৈঠকে পরমাণু সহযোগিতা, অত্যাধুনিক ‘সুখোই এসইউ-৫৭’ যুদ্ধবিমান সংক্রান্ত আলোচনা এবং রাশিয়ার অশোধিত তেলের ওপর মার্কিন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার মতো জটিল বিষয়গুলি নিয়ে বিশদ আলোচনা হতে পারে।
ভারতের আসল লাভ কোথায়?
ব্রিকস আয়োজন করে ভারত কেবল কূটনৈতিক জায়গাতেই নয়, বরং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী ফায়দা তুলতে চাইছে। ভারতীয় ব্যবসার পরিধি বাড়ানো এবং বাণিজ্যকে আরও সহজতর করা এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে সদস্য দেশগুলিতে ব্যবসা করতে গেলে পেমেন্ট সংক্রান্ত জটিলতা, সার্টিফিকেশন বাধা এবং অর্থায়নের সীমিত সুযোগের মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সংস্থোগুলিকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের উচিত এই সভাপতিত্বের সুযোগ কাজে লাগিয়ে রফতানি পেমেন্ট দ্রুততর করা এবং পরিকাঠামো প্রকল্পগুলির অর্থায়ন নিশ্চিত করা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ব্রিকস দেশগুলিতে ভারতের পণ্য রফতানি প্রায় ৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং পরিষেবা রফতানি ছিল ৩১.৩ বিলিয়ন ডলার। এই পরিস্থিতিতে ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিজিটাল পরিষেবা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রগুলিতে ভারতের লাভবান হওয়ার বিশাল সুযোগ রয়েছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ও গ্লোবাল সাউথ নীতি
বাণিজ্যের পাশাপাশি আর্থিক সংযোগের ক্ষেত্রেও ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট মডেল এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে। ব্রিকস সদস্য দেশগুলির মধ্যে আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে জোরালো সওয়াল করে আসছে ভারত। এর মূল লক্ষ্য কোনো পৃথক ব্রিকস মুদ্রা তৈরি করা নয়, বরং লেনদেন প্রক্রিয়াকে সহজ করা। ভারতের ইউপিআই (UPI) মডেল এক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে একটি আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান অর্থনীতিগুলির মধ্যে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার মোক্ষম মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছে এই ব্রিকস সম্মেলন। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে সংস্কারের দাবি জোরালো করার ক্ষেত্রে ভারতের এই নেতৃত্ব আগামী দিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চলেছে।