আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন: বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের মুখে ভারত!

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ব্রিকস গোষ্ঠীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন। এটি কেবল গতানুগতিক কোনো আন্তর্জাতিক বৈঠক নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চ। প্রায় দুই দশক আগে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন এই গোষ্ঠীটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন ১১টি দেশের একটি শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে। মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর এবার এই শক্তিশালী ব্লকে যোগ দিয়েছে ইন্দোনেশিয়াও।
বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেক এখন ব্রিকসের আওতায়
বিশাল এই সদস্য সংখ্যার সুবাদে ব্রিকস এখন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করছে। ভারত বরাবরই এই মঞ্চটিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালোভাবে তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। তবে এবারের আয়োজনে নয়াদিল্লির সামনে রয়েছে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য এবং এই বিশাল আকারের জোটকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা বেশ কঠিন এক পরীক্ষা হতে চলেছে।
সম্প্রসারণের পর শক্তির নতুন উৎস
সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ব্রিকস এখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশের পাশাপাশি প্রধান ভোক্তা দেশগুলোকেও এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে। এর সঙ্গে দ্রুত বর্ধনশীল উৎপাদনমুখী অর্থনীতির দেশগুলো যুক্ত হওয়ায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই জোটের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। নয়াদিল্লি ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য আরও বাড়ানোর জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এই লক্ষ্যেই লেনদেনের খরচ কমানো এবং শুল্ক বিধিমালা সহজ করার কাজ চলছে। পাশাপাশি, ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনাও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ভারত, চীন ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণ
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বৈঠকের রেশ কাটতে না কাটতেই ভারত, চীন ও রাশিয়ার শীর্ষ নেতারা আবারও এক মঞ্চে মিলিত হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকগুলোর দিকে এখন বিশ্ববাসীর নজর। এই জটিল কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা ভারতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের মতো জটিলতা রয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত অংশীদার। ব্রিকস মঞ্চ হয়তো এই সমস্ত বিরোধের রাতারাতি সমাধান করবে না, তবে নয়াদিল্লিকে নিজেদের কৌশলগত অংশীদারিত্বগুলো আরও নিখুঁতভাবে পরিচালনার সুযোগ করে দেবে।
ডলারের বিকল্প নাকি বাণিজ্যের সহজীকরণ? ভারতের সতর্ক অবস্থান
চলতি সম্মেলনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টি অন্যতম প্রধান আলোচ্যসূচি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ভারত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলছে। নয়াদিল্লি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের মূল লক্ষ্য আন্তঃসীমান্ত লেনদেন সস্তা ও সহজ করা, কোনো নির্দিষ্ট মুদ্রার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো নয়। বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলও এর আগে পরিষ্কার করেছেন যে ভারত কোনো অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রার পক্ষে নয়। পরিবর্তে, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং লেনদেন ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া থেকেও ব্রিকস দেশগুলোর ডিজিটাল মুদ্রা একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় ঐকমত্যের বড় সুযোগ
এত বড় এবং বৈচিত্র্যময় একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সব বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন হলেও, জ্বালানি খাত এমন একটি জায়গা যেখানে সব দেশের স্বার্থ এক বিন্দুতে মিলেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান এবং রাশিয়ার মতো বিশ্বের প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন এই জোটে রয়েছে। অন্যদিকে ভারত ও চীনের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ভোক্তা দেশগুলোও এর অংশ। ভারতের মূল মনোযোগ এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, নতুন প্রযুক্তি এবং স্থায়িত্বের দিকে। একদিকে উৎপাদনকারী দেশগুলো যেমন নিরাপদ বাজার খুঁজছে, তেমনই ভোক্তা দেশগুলোর প্রধান চাহিদা সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা। ফলে এই খাতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও বড় সিদ্ধান্ত আসার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।