“পিলারের বদলে কড়িকাঠ!”-ভাড়ার লোভে ৬ তলা বাড়ি বানিয়ে ৭ প্রাণ কাড়ল মালিক

দিল্লির সত্য নিকেতনে ছয় তলা বাড়ি ভেঙে অকালে সাতটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। এফআইআরে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুরোনো ভিত যে অতিরিক্ত ভার বহন করতে পারবে না, তা জেনেশুনেও শুধুমাত্র মোটা অংকের ভাড়ার লোভে তার উপরে বেআইনিভাবে আরও চারটি তলা তৈরি করা হয়েছিল। অতিরিক্ত ওজনের ফলেই বাড়িটির ভার বহনের ক্ষমতা বিপজ্জনক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে পুলিশ। সেই বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের পাশাপাশি ধসে পড়া ওই বাড়ির অবশিষ্ট অংশ বুধবারের মধ্যেই ভেঙে ফেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিল্লি পুরনিগম (MCD)।

এ ছাড়া ওই বাড়ির ঠিক পাশেই থাকা আরও একটি জবরদখল ও দুর্বল বাড়িকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছে এমসিডি। এমসিডি কমিশনার সঞ্জীব খিরওয়ার জানিয়েছেন, পাশের বাড়িটির কাঠামো এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে তাকে আর নিরাপদ বলে মনে করা হচ্ছে না। বিপদ এড়াতে আপাতত পিছনে এবং মাঝের অংশে ১৮ থেকে ২০টি লোহার গার্ডরেল বসানো হলেও তা একেবারেই সাময়িক ব্যবস্থা। আগামী এক থেকে দু’দিনের মধ্যেই অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে ওই ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িটিও ভেঙে ফেলা হবে।

পিলার ও বিম ছাড়াই তৈরি হয়েছিল বহুতল!
এফআইআরে মূল অভিযুক্ত বাড়ির মালিক ৮১ বছরের হরিরাম গুপ্তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এনেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের স্পষ্ট দাবি, প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো কাঠামোর ভিত অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার মতো শক্তিশালী ছিল না। তা জেনেও অধিক উপার্জনের আশায় উপরের দিকে একের পর এক চারটি তলা চাপিয়ে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত নির্মাণ ও নতুন তলার চাপে কাঠামোর স্থায়িত্ব নষ্ট হয়েই এই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের একাংশের মতে, ওই বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে প্রয়োজনীয় পিলার ও বিম পর্যন্ত ছিল না। এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ পদ্ধতি যেকোনো ভবনের স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।

৩০টি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতেন ৭৫ জন পড়ুয়া
ভেঙে পড়া ওই বহুতলটিতে মোট ৩০টি ছোট ঘরে রাখা হয়েছিল ৭৫টি বেড। মাসে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা চড়া ভাড়া দিয়ে ওই সংকীর্ণ কুঠুরিতেই গাদাগাদি করে দুই থেকে তিন জন করে পড়ুয়া বসবাস করতেন। রবিবার দুপুরের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মোট সাত জনের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে পাঁচ জনই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন অভিষেক কুমার, যুবরাজ সোনি, পবন কুমার, অর্পিত জাহাজ এবং অক্ষত সিংহ যাদব। এ ছাড়া সুরিন্দর সিংহ ও পবন লাল কোরি নামে দুই শ্রমিকেরও মৃত্যু হয়েছে।

গ্রেপ্তার মালিক, স্ত্রী ও ছেলে
ঘটনার পরই গা ঢাকা দেওয়া মূল অভিযুক্ত হরিরাম গুপ্তাকে রাজস্থানের ভিওয়াড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাশাপাশি তাঁর ৭৫ বছরের স্ত্রী উর্মিলা গুপ্তা এবং ৫২ বছরের ছেলে মহেশ গুপ্তাকেও জালে তুলেছে পুলিশ। এর মধ্যে হরিরাম ও তাঁর স্ত্রীকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে এবং তাঁদের ছেলেকে দু’দিনের পুলিশ হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর আশপাশের আরও ছ’টি ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি সিল করে দিয়েছে এমসিডি। দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর রাজধানীর সমস্ত পিজি হাবে থাকা ভবনের বাধ্যতামূলক স্ট্রাকচারাল অডিট করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে এই অডিট প্রক্রিয়া শেষ করার কথা রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *