গঙ্গায় ভাঙল পুরনো রেকর্ড! পাটনা থেকে বিহারের ১২ জেলায় প্লাবন, মৃত বেড়ে ২০

বিহারে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বর্ষার বন্যা। গঙ্গা, কোসি, গন্ডক, বুড়ি গন্ডক, পুনপুন এবং বাগমতী সহ একাধিক প্রধান নদীর জল উপচে পড়ে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিহারের ১২টি জেলার ৭০টি ব্লকের ৩৬৮টি পঞ্চায়েত সম্পূর্ণ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২২ লক্ষ ৪২ হাজার মানুষ। নদীগুলির জলস্তর ক্রমাগত বিপদসীমার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ায় গোটা রাজ্যে স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নজিরবিহীন জলস্তর ও নদী বাঁধ ভাঙার হিড়িক
রাজধানী পাটনা সহ রাজ্যের বহু এলাকায় নদীর জলস্তর অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। পাটনার গান্ধী ঘাটে গঙ্গা নদীর জলস্তর রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ ৫০.৫৭ মিটারে পৌঁছেছে, যা ২০১৬ সালের ৫০.৫২ মিটারের আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই নজিরবিহীন জলস্ফীতির জেরে পাটনা শহরের বিস্তীর্ণ অংশে ইতিমধ্যেই জল ঢুকে পড়েছে। এর পাশাপাশি ছাপরার দরিয়াপুরে মাহি নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এবং ভাগলপুরের রিং ড্যাম উপচে পড়ে হাজার হাজার কাঁচা ও পাকা বাড়ি জলের তলায় চলে গেছে। সমস্তিপুরে একটি চার লেনের আন্ডারপাসের সংযোগ সড়ক হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ার পাশাপাশি এনএইচ-৮০ (NH-80) সড়কের ওপর দিয়ে দুই ফুট পর্যন্ত গভীর জল বয়ে চলেছে।
তারকা থেকে রাজনীতিবিদ—জলবন্দি সকলেই
এই সর্বগ্রাসী বন্যার হাত থেকে সাধারণ মানুষ তো বটেই, রেহাই পাননি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গও। ভোজপুরের প্রখ্যাত ভোজপুরি তারকা তথা বিজেপি এমএলসি পবন সিংয়ের মারুতি নগরের বাসভবনেও বন্যার জল ঢুকে পড়েছে। অন্যদিকে, ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ ও দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে যাওয়ার পথে পূর্ণিয়ার সাংসদ পাপ্পু যাদবের গাড়িবহর ভোজপুরের বন্যা কবলিত বারহারা এলাকায় প্রবল স্রোতে আটকে পড়ে। গাড়ি কোমর-সমান জলে আটকে যাওয়ার পর সাংসদ নিজে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন এবং গ্রামবাসীদের কুশল সংবাদ নিতে ও তাঁদের সমস্যার কথা শুনতে কোমরজলে হেঁটে দুর্গত এলাকায় এগিয়ে যান।
প্রাণহানি ও উদ্ধারকাজে প্রশাসনের তৎপরতা
এই ভয়াবহ দুর্যোগের জেরে রাজ্যজুড়ে এখনও পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ভোজপুর জেলার মুফসসিল থানা এলাকায় বন্যার জলে ডুবে ৯ বছরের আরিয়ান এবং ১১ বছরের শিবজি পাসওয়ান নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। দুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রাণ সরবরাহের জন্য এনডিআরএফ (NDRF)-এর ১০টি দল এবং এসডিআরএফ (SDRF)-এর ২৭টি দল মাঠে নামানো হয়েছে। এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনতে ১,৪২৯টি নৌকা দিনরাত নিরন্তর কাজ করে চলেছে।
আবহাওয়া দপ্তরের নতুন সতর্কতা
ইতিমধ্যে আবহাওয়া দপ্তরের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজ্যের ৯টি জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি, ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া এবং বজ্রঝড়ের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার বিপদের সঙ্গে আবহাওয়া দপ্তরের এই লাগাতার সতর্কবার্তা আগামী দিনে বিহারের বাসিন্দাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।