৪৬ বছর ধরে উধাও ভল্টের চাবি! কালীঘাটের মা কালীর বিপুল সম্পত্তি ও অলঙ্কার নিয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

কালীঘাট মন্দিরের মা কালীর নামে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ও অমূল্য অলঙ্কারের নিরাপত্তা নিয়ে এবার নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ। দেবীর অলঙ্কার থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তদের দান করা মূল্যবান সামগ্রীর পূর্ণাঙ্গ হিসাব, শেষ কবে তার স্টক মেলানো হয়েছিল এবং আদৌ সেই সমস্ত সম্পদ সুরক্ষিত রয়েছে কি না—এই সমস্ত বিষয় জানতে চেয়ে সরাসরি দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা জজের কাছে একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ জমা দিয়েছে ওই পরিবার পরিষদ।
ভল্টের চাবি উধাও চার দশক ধরে?
পদাধিকারবলে কালীঘাট মন্দির পরিচালন কমিটির চেয়ারম্যান হলেন সংশ্লিষ্ট জেলা জজ। অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী, মন্দিরের সমস্ত মূল্যবান সামগ্রী ও সোনাদানা সুরক্ষিত রাখার জন্য একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নির্দিষ্ট ভল্ট রয়েছে। কিন্তু সবথেকে ভয়ের বিষয় হলো, সেই ভল্টের মূল চাবি নাকি দীর্ঘ ১৯৮০ সাল থেকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! ফলস্বরূপ, বিগত প্রায় চার দশক ধরে মন্দিরের সেই কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ঠিক কোন অবস্থায় রয়েছে এবং তা আদৌ নিরাপদ আছে কি না, তা নিয়ে গভীর ধোঁয়াশা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সাবর্ণ পরিবার পরিষদের তরফ থেকে আনীত এই সমস্ত অভিযোগ এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত নয়।
পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায়চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মন্দিরের মহার্ঘ সম্পদ দেখভাল এবং তার সঠিক হিসাব সংরক্ষণের জন্য যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল, তার মেয়াদ বহু আগেই ফুরিয়ে গিয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে যথাযথ সরকারি নজরদারি না থাকায় মন্দিরের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারে। এই কারণেই ভল্টের চাবি হারিয়ে যাওয়ার গোটা ঘটনাটিকে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আওতায় আনার পাশাপাশি ওই ভল্ট খুলে সমস্ত সামগ্রী নতুন করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নথিভুক্ত করার জোরদার আবেদন জানানো হয়েছে।
পরিচালনা কমিটির বৈধতা ও নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক
শুধু সম্পত্তির হিসাব বা ভল্টের চাবি নয়, কালীঘাট মন্দিরের সামগ্রিক পরিচালন ব্যবস্থার বৈধতা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে সাবর্ণ পরিবার। তাঁদের অভিযোগ, ২০১৪ সালের পর থেকে মন্দির পরিচালন কমিটির কোনো নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়নি। পরিষদের যুক্তি অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট নির্দেশিকা অনুসারে নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ সাধারণত পাঁচ বছর। সেই কাঠামোর নিয়ম মেনেই সেবায়েতদের মধ্য থেকে পাঁচজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা। এর পাশাপাশি মন্দিরের দৈনন্দিন কাজকর্মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন ছয়জন বিশিষ্ট সদস্যকে বাইরে থেকে কমিটিতে রাখারও স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। জেলা জজের সেই পরিচালন কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার কথা।
এ ছাড়াও, মন্দিরে আসা দর্শনার্থীদের দেওয়া দানসামগ্রীর সঠিক দেখভালের সমস্ত দায়িত্ব দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনকে হস্তান্তর করার নির্দেশ অতীতে কলকাতা হাইকোর্ট দিয়েছিল বলেই দাবি করেছে অভিযোগকারী সংগঠন। হাইকোর্টের সেই নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে এবং তার ওপর প্রশাসনের কোনো নিয়মিত নজরদারি রয়েছে কি না—তা নিয়ে জোরালো সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, মন্দির পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত কোনো নিয়মকানুন বা স্বচ্ছতা মানা হচ্ছে না, যার জেরে পুরো ব্যবস্থাপনায় চূড়ান্ত অনিয়ম বাসা বেঁধেছে।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও মন্দিরের অন্দরমহল
অন্যদিকে, মন্দিরের বর্তমান পরিচালনা কাঠামো ও নির্বাচন সংক্রান্ত জল্পনার জবাবে দীর্ঘদিনের কোষাধ্যক্ষ কল্যাণ জানিয়েছেন যে, ইতিমধ্যেই নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতি শুরু করে দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, কালীঘাট মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক অবশ্য আজ নতুন কিছু নয়। এর আগে প্রায় দু’দশক আগে, ২০০৬ সালেও মন্দিরের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ গড়ায় সোজা কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। বর্তমান পরিস্থিতিতে জেলা জজের কাছে জমা পড়া এই নতুন অভিযোগের পর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন সকলের নজর রয়েছে।