পৃথিবীর গর্ভের তাপে জ্বলবে বাতি! লাদাখে দেশের প্রথম জিওথার্মাল কূপে তৈরি হবে বিদ্যুৎ, বিপ্লব ঘটাতে চলেছে ভারত

সৌর ও বায়ুশক্তির পাশাপাশি এবার পৃথিবীর গভীরে লুকিয়ে থাকা তাপকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করল ভারত। দেশের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে শুরু হয়েছে ভূ-তাপীয় শক্তির ব্যবহার। সরকারের লক্ষ্য, ২০৭০ সালের ‘নেট জিরো’ লক্ষ্যে এগোনোর পাশাপাশি এই শক্তিকে দেশের নবীকরণযোগ্য শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলা।

এই উদ্যোগে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাইলফলক অর্জিত হয়েছে লাদাখের পুগা উপত্যকায়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ONGC Energy Centre সেখানে দেশের প্রথম দুটি ভূ-তাপীয় কূপ চালু করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত পুগা উষ্ণ প্রস্রবণ এবং ভূগর্ভস্থ তাপের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। প্রায় ১,০০০ মিটার গভীর এই কূপগুলি ভূ-তাপীয় জলাধারের মূল্যায়নের পাশাপাশি দেশের প্রথম ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার পরীক্ষামূলক ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ প্রকল্পের পথ খুলে দিয়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ভূ-তাপীয় শক্তি? সৌর বা বায়ুশক্তির ক্ষেত্রে আবহাওয়ার উপর নির্ভর করতে হলেও, ভূ-তাপীয় শক্তির ক্ষেত্রে সেই সমস্যা থাকে না। পৃথিবীর অভ্যন্তরের তাপ থেকে পাওয়া গরম জল ও বাষ্প ব্যবহার করে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব। গভীর কূপের মাধ্যমে গরম জল বা বাষ্প উপরে তুলে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয় এবং ব্যবহৃত জল পুনরায় ভূগর্ভস্থ জলাধারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, কৃষি, জলজ চাষ, ভবন গরম ও ঠান্ডা রাখার মতো কাজেও এই শক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।

কোথায় রয়েছে দেশের সম্ভাবনা? ভারতের ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ ইতিমধ্যেই দেশের ৩৮১টি উষ্ণ প্রস্রবণ এবং ১০টি ভূ-তাপীয় অঞ্চল শনাক্ত করেছে। তাত্ত্বিক বিচারে দেশের ভূ-তাপীয় শক্তির সম্ভাবনা প্রায় ১০.৬ গিগাওয়াট। হিমালয় থেকে আন্দামান-নিকোবর, সোন-নর্মদা-তাপ্তি অঞ্চল, পশ্চিম উপকূল, ক্যাম্বে গ্র্যাবেন, আরাবল্লী, মহানদী ও গোদাবরী অববাহিকায় এই সম্পদের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি নতুন কূপ খননের পাশাপাশি পরিত্যক্ত তেল ও গ্যাসের কূপগুলি পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমেও শক্তি আহরণের কাজ চলছে, যার সফল পরীক্ষামূলক প্রয়োগ দেখা গিয়েছে গুজরাটের আঙ্কলেশ্বর ও গান্ধীনগরে।

বিশ্বে ভূ-তাপীয় শক্তির স্থাপিত ক্ষমতা যেখানে ১৫.৬৭ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, সেখানে ভারতে এই প্রথম বাণিজ্যিক ও পরীক্ষামূলক প্রকল্পের হাত ধরে এক নতুন যুগের সূচনা হলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *