সৎ সিদ্ধান্ত নিলেই শাস্তির খাঁড়া, চুপ থাকলেই পুরস্কার! সরকারি দপ্তরের অন্দরে ঠিক কী ভয়ংকর খেলা চলছে?

ভারতে প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি আর অদক্ষতাকেই একমাত্র খলনায়ক হিসেবে দেগে দেওয়া হয়েছে, অথচ আসল সমস্যা লুকিয়ে রয়েছে এক নীরব নিষ্ক্রিয়তায়। অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস কর্তা ও হরিয়ানার প্রাক্তন ডিজিপি ও পি সিং-এর নতুন বই ‘ডিসিশন ভেলোসিটি: র‍্যাশনাল অ্যাবডিকেশন, দ্য ফিয়ার ট্যাক্স, অ্যান্ড দ্য রোড টু বিকশিত ভারত’-এ উঠে এসেছে এমনই এক উদ্বেগের ছবি। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারি ফাইলে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার এই যে সংস্কৃতি, তার মাসুল প্রতিদিন অজান্তে চোকাতে হচ্ছে দেশের সাধারণ নাগরিক ও অর্থনীতিকে।

বইটিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণার অবতারণা করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফিয়ার ট্যাক্স’ বা ভয়ের মাশুল। এটি রাজস্ব দপ্তর মারফত সংগৃহীত কোনো প্রত্যক্ষ কর নয়; বরং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে নাগরিকদের জীবন ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে নেমে আসা এক অদৃশ্য বোঝা। বর্তমান প্রশাসনিক নজরদারি কাঠামো কোনো কাজের ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি চুলচেরা অডিট বা তদন্তে যতটা কড়া, কোনো ফাইল ফেলে রাখার ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই উদাসীন। ফলে লাল ফিতের ফাঁসে আটকে থাকা কর্তারা ঝুঁকি এড়াতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে চুপ থাকাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছেন।

এই মানসিকতাকে বইটিতে ‘র‍্যাশনাল অ্যাবডিকেশন’ বা যৌক্তিক দায়িত্ব পরিহার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কয়লা কাণ্ডের মতো দৃষ্টান্তের জেরে অডিটের আতঙ্ক সরকারি কর্মীদের এতটাই গ্রাস করেছে যে, কোনো কর্মকর্তা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেও বছরের পর বছর বা সরকার বদলের পর তা তদন্তের আতশকাচের নিচে পড়ার ভয় থাকে। তাই ভুল কাজের জন্য শাস্তির মুখে পড়ার ঝুঁকির তুলনায় কোনো কাজ না করে ফাইল আটকে রাখা, কমিটিতে পাঠানো কিংবা বদলির অপেক্ষা করাই আমলাদের টিকে থাকার মূল কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য দেশ নিয়েছে, এই শ্লথ গতি তার সবচেয়ে বড় অন্তরায়। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং মেধার বিশ্বজোড়া প্রতিযোগিতায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণই যেকোনো দেশের মূল চালিকাশক্তি। প্রশাসনিক দেরির কারণে যখন কোনো শিল্প প্রকল্প অন্য রাজ্যে বা অন্য দেশে সরে যায়, অথবা কোনো উদ্যোগপতির উদ্ভাবন মাঝপথে থমকে যায়, তখন সেই ভয়ের মাশুল পুরো অর্থনীতিকেই বইতে হয়।

এই অচলাবস্থা কাটিয়ে প্রশাসনিক গতি বা ‘ডিসিশন ভেলোসিটি’ ফেরাতে নিয়মকানুন অন্ধভাবে মানার বদলে কাজের ফলাফলের ওপর নজর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নজরদারি পরিকাঠামোয় সৎ ভুল ও প্রকৃত গাফিলতির মধ্যে ফারাক করা এবং সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি কর্মীদের ‘সেফ স্পেস’ বা সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমলাতন্ত্রের অলিন্দে আটকে থাকা নিষ্ক্রিয়তার দেওয়াল ভেঙে সঠিক সময়ে কলম চালানোর সাহস জোগানোই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির আসল পথ বলে জোর দেওয়া হয়েছে এই আলোচনায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *