খারাপ সিবিল স্কোর নিয়ে চিন্তায় আছেন? মাত্র ৬ মাসের মধ্যে স্কোর ৭৫০-এ তোলার জাদুকরি উপায়!

বর্তমান ডিজিটাল ও আর্থিক লেনদেনের যুগে গৃহঋণ (Home Loan), ব্যক্তিগত ঋণ (Personal Loan) কিংবা একটি সাধারণ ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ক্রেডিট বা সিবিল স্কোর (CIBIL Score)। সাধারণত ৩০০ থেকে ৯০০-র এই স্কেলে আপনার ক্রেডিট স্কোর যদি ৭৫০-এর ওপরে থাকে, তবে ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আপনাকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য গ্রাহক বলে মনে করে। ফলে খুব সহজেই কম সুদে লোন বা ক্রেডিট কার্ডের অনুমোদন মেলে। কিন্তু কোনো কারণে আপনার ক্রেডিট স্কোর যদি নেমে যায়, তবে কি মাত্র ৬ মাসের মধ্যে তা আবার বাড়িয়ে ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব?
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও ক্রেডিট বিশ্লেষকদের মতে, আপনার ক্রেডিট স্কোর রাতারাতি ম্যাজিকের মতো না বাড়লেও, নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চললে ঠিক ৬ মাসের মধ্যেই সিবিল স্কোরে দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্পূর্ণ সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
৬ মাসে ক্রেডিট স্কোর বাড়ানোর সেরা কৌশলগুলি
ক্রেডিট ব্যুরো যেমন CIBIL, Experian কিংবা Equifax প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ দিন অন্তর ব্যাঙ্ক ও ফাইন্যান্স সংস্থাগুলোর কাছ থেকে গ্রাহকদের লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করে। তাই ধারাবাহিকভাবে সঠিক পদক্ষেপ নিলে ৬টি বিলিং সাইকেলের মধ্যেই স্কোরে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়:
সময়মতো ইএমআই ও বিল পরিশোধ (Payment History): সিবিল স্কোরের প্রায় ৩৫% নির্ভর করে আপনার ঋণ পরিশোধের অতীতের ওপর। কোনো ক্রেডিট কার্ডের বিল বা ঋণের ইএমআই (EMI) নির্ধারিত শেষ তারিখের (Due Date) একদিনও পরে দেওয়া চলবে না। অটো-ডেবিট বা রিমাইন্ডার সেট করে ক্রেডিট কার্ডের ন্যূনতম টাকার বদলে পুরো বকেয়া মেটানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
ক্রেডিট ইউটিলাইজেশন রেশিও (CUR) ৩০%-এর নিচে রাখা: আপনার মোট ক্রেডিট কার্ডের লিমিটের ৩০%-এর বেশি খরচ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন—আপনার কার্ডের মোট লিমিট যদি ১ লাখ টাকা হয়, তবে মাসে ৩০,০০০ টাকার মধ্যে খরচ সীমিত রাখুন। ক্রেডিট লিমিটের অতিরিক্ত ব্যবহার ব্যাঙ্ককে ইঙ্গিত দেয় যে আপনি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, যা স্কোর দ্রুত কমিয়ে দেয়।
ক্রেডিট রিপোর্টে ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়া (Dispute Resolution): অনেক সময় ব্যাঙ্ক বা ক্রেডিট ব্যুরোর ভুলেই গ্রাহকের স্কোরে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ভুলবশত কোনো পরিশোধিত ঋণকে ‘বকেয়া’ দেখানো কিংবা আপনার প্যান কার্ডে অন্য কারও ঋণ যুক্ত হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই বছরে অন্তত একবার বিনামূল্যে সিবিল রিপোর্ট ডাউনলোড করে চেক করুন এবং কোনো ভুল থাকলে দ্রুত ব্যুরোর ওয়েবসাইটে ‘Dispute’ ফাইল করুন। ভুল সংশোধিত হলেই স্কোর এক লাফে অনেকটা বেড়ে যায়।
যে ভুলগুলির কারণে স্কোর আরও কমে যেতে পারে
একসাথে একাধিক জায়গায় ঋণের আবেদন (Hard Inquiries): দ্রুত টাকার প্রয়োজনে একসাথে ৩-৪টি ব্যাঙ্ক বা লোন অ্যাপে আবেদন করবেন না। প্রতিটি আবেদনের জন্য সংস্থাগুলো আপনার ক্রেডিট প্রোফাইলে ‘Hard Inquiry’ করে, যা সাময়িকভাবে সিবিল স্কোর নামিয়ে দেয়।
পুরোনো ক্রেডিট কার্ড হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া: পুরোনো ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ভালো লেনদেনের ইতিহাস তৈরি হয় (Credit History Length)। হুট করে পুরোনো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিলে ক্রেডিটের গড় বয়স কমে যায়, যা স্কোরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
লোন ‘সেটেলমেন্ট’ এড়িয়ে চলুন: ব্যাঙ্কের সাথে আলোচনা করে ঋণ ‘Settled’ বা কিছু টাকা ছাড় করিয়ে মেটালে আপনার সিবিল রিপোর্টে ‘Settled’ লেখা উঠে যায়, যা আগামী ৭ বছরের জন্য নতুন ঋণ পাওয়ার পথ প্রায় বন্ধ করে দেয়। ছাড় না নিয়ে সম্পূর্ণ বকেয়া মেটানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
নতুন ও অনভিজ্ঞ গ্রাহকদের জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ
যাঁদের একেবারেই কোনো ক্রেডিট হিস্ট্রি নেই বা সিবিল স্কোর অত্যন্ত খারাপ, তাঁরা কোনো ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট (FD)-এর বিপরীতে একটি ‘সিকিউরড ক্রেডিট কার্ড’ (Secured Credit Card) নিতে পারেন। এই কার্ডের বিল সবসময় সময়মতো মেটালে মাত্র ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে একটি চমৎকার ক্রেডিট প্রোফাইল তৈরি হয়ে যায়।
মনে রাখবেন, ক্রেডিট স্কোর বাড়ানো কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, এটি সম্পূর্ণভাবে আপনার আর্থিক শৃঙ্খলার প্রতিফলন। ইএমআই মিস না করা, ক্রেডিট লিমিট নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ঘনঘন ঋণের আবেদন না করার মতো সহজ নিয়মগুলো ৬ মাস কঠোরভাবে মেনে চললে আপনার সিবিল স্কোর আবার ৭৫০-এর গণ্ডি পার করতে বাধ্য।