জিডিপি গ্রোথ কি তবে আড়াই শতাংশ? প্রাক্তন অর্থসচিবের বিস্ফোরক দাবিতে দেশজুড়ে তোলপাড়!

ভারতের মোট দেশীয় উৎপাদন বা জিডিপি (GDP) এর প্রকৃত বিকাশ হার নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ও নীতিগত মহলে আবারও একপ্রস্ত তীব্র রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাবেক অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ ভারতের বাস্তব জিডিপি বৃদ্ধির হার মাত্র ২.৬ শতাংশ বলে একটি বিস্ফোরক দাবি করার পর এবং কংগ্রেস দল সেই দাবি তাদের অফিশিয়াল ‘এক্স’ (X) হ্যান্ডেলে পোস্ট করার পর থেকেই এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে সরকারের তরফ থেকে এবং শীর্ষস্থানীয় পরিসংখ্যানবিদরা এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রকের সঙ্গে যুক্ত সরকারি সূত্রগুলির বক্তব্য, প্রাক্তন সচিবের এই গণনা পদ্ধতি প্রযুক্তিগত, গাণিতিক এবং পরিসংখ্যানগত দিক থেকে পুরোপুরি ভুল ও বিভ্রান্তিকর।

সুभाष চন্দ্র গর্গের বিতর্কিত দাবি কী?

দেশের সাবেক অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ ভারতের সরকারি জিডিপি পরিসংখ্যানের ওপর প্রশ্ন তুলে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যদি মহামারী পূর্ববর্তী ডেটা এবং বর্তমান ত্রৈমাসিকের মধ্যে চক্রবৃদ্ধি হার (CAGR) বা ভিন্ন ভিত্তি বছর বিবেচনা করা হয়, তবে প্রকৃত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার মাত্র ২.৬ শতাংশ দাঁড়ায়। তাঁর মতে, সরকারের পক্ষ থেকে যে ৭ থেকে ৮ শতাংশ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে, তা কেবল ‘বেস এফেক্ট’ বা পরিসংখ্যানের উপস্থাপনার ফল মাত্র এবং এটি অর্থনীতির আসল আকারকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলে না।

অন্যদিকে, বিরোধী দল কংগ্রেস তাদের এক্স হ্যান্ডেলে কটাক্ষ করে লিখেছে যে, মোদি সরকারের আমলেই সাবেক অর্থসচিব ফাঁস করে দিয়েছেন কীভাবে সরকারিভাবে জিডিপি তথ্যে গরমিল করা হয়েছে। কংগ্রেসের দাবি, সরকার কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধির হার দেখাতে সচেতনভাবে গত বছরের জিডিপি কমিয়ে দেখিয়েছে, অন্যথায় আসল বৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশের বদলে মাত্র ২.৬ শতাংশ হতো।

সরকারি সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের কড়া জবাব

সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের আধিকারিকদের মতে, পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক (MoSPI), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্ব ব্যাঙ্কের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও নির্ধারিত মানদণ্ড মেনেই জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব করা হয়। নিজের ইচ্ছামতো বিভিন্ন সময়কাল বা আলাদা ভিত্তি বছরকে এক করে হিসাব কষা আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী।

সরকারি বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের (Recovery Phase) নির্দিষ্ট কোনো একটি তথ্যকে বাছাবাছি করে পুরো অর্থনীতির ওপর চাপিয়ে দিলে তা থেকে সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত উঠে আসে। এছাড়া রেকর্ড জিএসটি সংগ্রহ, ইউপিআই লেনদেনের বিশাল উল্লম্ফন, শক্তিশালী ক্রেডিট গ্রোথ এবং পরিকাঠামো খাতে সরকারের রেকর্ড মাত্রায় মূলধন ব্যয় (Capex) প্রমাণ করে যে ভারতীয় অর্থনীতি অত্যন্ত শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ৬.৭ থেকে ৭.৮ শতাংশ বাস্তব হারে এগিয়ে চলেছে।

পরিসংখ্যান মন্ত্রকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সঠিক তুলনার জন্য দুই ক্ষেত্রেই একই পদ্ধতি এবং একই ডেটা সোর্স ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। নতুন সিরিজ অনুযায়ী নামমাত্র জিডিপি ৮০ লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি টাকা (১০.৩ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং বাস্তব জিডিপি ৭৫.৪৬ লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে ৮১.৩৬ লক্ষ কোটি টাকা (৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি) হয়েছে। ফলে পুরোনো সিরিজের কোনো অংশবিশেষের সঙ্গে নতুন সিরিজের তথ্য ইচ্ছামতো জোড়াতালি দিয়ে মে মেলানো বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব ও অবৈজ্ঞানিক।

এর অর্থনৈতিক প্রভাব কী?

অর্থনৈতিক তথ্যের এই ধরনের অ-মানদণ্ডগত বিশ্লেষণ কেবল বাজারে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধোঁয়াশা এবং বিভ্রান্তিই তৈরি করে না, বরং দেশের উদীয়মান আর্থিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থাকেও ক্ষুণ্ন করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ভারতের জিডিপি গণনার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানগত নীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারত বিশ্বমঞ্চে অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে।

Editor001
  • Editor001

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *