এশিয়ার নোবেল জয় বাংলাদেশের! প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাজিমাত রুনা খানের

এশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা রামন ম্যাগসেসে পুরস্কার ২০২৬-এর বিজয়ীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ বছর এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত এই আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সমাজকর্মী এবং ‘ফ্রেন্ডশিপ’ নামক খ্যাতনামা এনজিও-র প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও বন্যা-কবলিত অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার আজীবন সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই prestigious পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। আগামী ১৫ই নভেম্বর ফিলিপাইনের ম্যানিলায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হবে।

কে এই রুনা খান?
১৯৫৮ সালের ১৭ই নভেম্বর জন্ম নেওয়া রুনা খান ঢাকা ও কলকাতা থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিক্ষকতা, পর্যটন এবং ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে প্রচলিত পেশাগত বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেন।

‘ফ্রেন্ডশিপ’ এনজিওর পথচলা
বাংলাদেশের নদী তীরবর্তী এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন বন্যার কারণে বহু গ্রাম মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই সমস্ত দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া ছিল এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলা করার ব্রত নিয়েই ২০০২ সালে ‘ফ্রেন্ডশিপ’ প্রতিষ্ঠা করেন রুনা খান।

নৌকাতেই ভাসমান হাসপাতাল
রুনা খানের সবচেয়ে অভিনব ও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো জলপথে ভাসমান হাসপাতাল পরিচালনা করা। একটি পুরোনো জাহাজকে পুরোপুরি হাসপাতালে রূপান্তর করে তিনি তা নদীপথের মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেন। অভিজ্ঞ চিকিৎসক দল, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রে সজ্জিত এই ভাসমান হাসপাতালগুলো এমন লক্ষাধিক মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছে, যাঁদের পক্ষে সাধারণ কোনো হাসপাতালে পৌঁছানো ছিল কল্পনার অতীত।

শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য রূপান্তর
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারেও তিনি বিপ্লব এনেছেন। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিপন্ন শিশুদের জন্য তিনি এমন অভিনব বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী সহজেই অন্যত্র স্থানান্তরিত করা যায়। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রামে শিশুদের পড়ানোর সময় মুখস্থ বিদ্যার বিরুদ্ধে তাঁর যে উপলব্ধি হয়েছিল, তা তাঁকে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচনে অনুপ্রাণিত করে। পরবর্তীকালে তিনি শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় গল্পের বই, শিক্ষকদের সহায়ক উপকরণ এবং নারী কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও কাজ করেন।

স্বাস্থ্য থেকে নারী ক্ষমতায়ন
বর্তমানে রুনা খানের প্রতিষ্ঠিত ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর কার্যক্রম কেবল চিকিৎসাসেবা বা শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ত্রাণ এবং নারী ক্ষমতায়নের মতো বহুমুখী ক্ষেত্রে কাজ করে এই সংস্থাটি প্রতি বছর ৭.৫ মিলিয়নেরও বেশি অভাবী মানুষকে সাহায্য করে আসছে। এর আগে তিনি অশোকা ফেলোশিপ, রোলক্স অ্যাওয়ার্ড এবং শোয়াব ফাউন্ডেশনের মতো বিশ্বমানের সম্মাননা লাভ করলেও, ২০২৬ সালের রামন ম্যাগসেসে পুরস্কার প্রাপ্তি তাঁর কাজের মুকুটে এক নতুন ও উজ্জ্বলতম সংযোজন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *