সামনে গমের বড় ছবি, আর পিছনে সূক্ষ্ম কারচুপি! বিখ্যাত বিস্কুট সংস্থার বিরুদ্ধে এই বিরাট পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র

খাবারের প্যাকেটের গায়ে যা বড় বড় হরফে লেখা থাকে, আদতে কি গ্রাহকরা সেই উপাদানই পেয়ে থাকেন? এই মৌলিক প্রশ্নটি বারবার সামনে এলেও এবার বিস্কুটের মোড়কের বিজ্ঞাপনী চমক নিয়ে এক চরম চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এল। বাজারে স্বাস্থ্যকর, প্রাকৃতিক বা অর্গানিক হিসেবে যে সমস্ত খাবার চড়া দামে বিক্রি করা হয়, সেগুলি আদতে কতটা স্বাস্থ্যসম্মত—তা নিয়েই বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। আটার তৈরি হোল হুইট বিস্কুট (Whole Wheat Biscuit) বলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আক্ষরিক অর্থেই প্রতারণা করার অভিযোগ ওঠার পর এবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কড়া আইনি পদক্ষেপ করেছে সেন্ট্রাল কনজিউমার প্রোটেকশন অথরিটি (CCPA)। সংশ্লিষ্ট বিস্কুট সংস্থাকে মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করার পাশাপাশি তাদের সমস্ত বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কীভাবে প্রকাশ্যে এল এই প্রতারণা?

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিওতে বেশ কিছু প্যাকেটজাত খাবার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এক জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার। সেখানে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয় যে, কীভাবে ‘স্বাস্থ্যকর’ বা ‘প্রাকৃতিক’ লেবেল সেঁটে সাধারণ মানুষকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। বিশেষ করে মেরি বিস্কুটের মোড়কে ‘হোল হুইট’ বা আটা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হলেও, নেপথ্যে চলছে অন্য খেলা। সোশ্যাল মিডিয়ার সেই ভাইরাল অভিযোগ সামনে আসার পরই নড়েচড়ে বসে কেন্দ্রীয় উপভোক্তা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ (CCPA) এবং স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে ঘটনার গভীরে যায়।

ছোট হরফের কারচুপি ও সিসিপিএ-র কড়া পর্যবেক্ষণ

সিসিপিএ-র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক অবিশ্বাস্য তথ্য। ওই নির্দিষ্ট মেরি বিস্কুটের প্যাকেটে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেটিতে নামমাত্র অর্থাৎ মাত্র ১৯.৫ শতাংশ আসল আটা রয়েছে, অথচ তার বিপরীতে প্রায় ৫২ শতাংশই ক্ষতিকারক ময়দা ব্যবহার করা হয়েছে! সবচেয়ে বড় অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়ে প্যাকেটের নকশায়। বিস্কুটটির মোড়কের সামনে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে বড় বড় অক্ষরে ‘Whole Wheat Marie Biscuits’ কথাটি লেখা রয়েছে এবং সঙ্গে বড় করে গমের ছবিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু ঠিক তার বিপরীত দিকে, অর্থাৎ প্যাকেটের পেছনে অত্যন্ত ছোট ও ঝাপসা হরফে উপাদানের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেখানে আসল সত্য হিসেবে ময়দার আধিক্য স্পষ্ট।

এই ধরনের ক্ষুদ্র ডিসক্লেমার বা শর্তাবলী যে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে CCPA। কমিশনার নিধি খারে এবং কমিশনার অনুপম মিশ্র যৌথভাবে তাঁদের নির্দেশিকায় স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, প্যাকেটের গায়ে অত্যন্ত ছোট অক্ষরে কিছু শর্ত লিখে কোনো সংস্থাই সাধারণ ক্রেতার সঙ্গে এমন বড় ধরনের বিভ্রান্তি ঢাকতে পারে না। নীল ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর এত ক্ষুদ্র সাদা হরফে লেখা থাকে যে তা সাধারণ কোনো ক্রেতার পক্ষেই পড়া প্রায় অসম্ভব।

কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মতে, প্যাকেজিংয়ের এই কারচুপি ক্রেতাদের সঠিক ও আসল তথ্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এবং ভুল সিদ্ধান্তে চালিত করে। এটিকে সোজা কথায় ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ (Dark Pattern) বা এক প্রকার অসৎ বাণিজ্যিক পদ্ধতি বলেই চিহ্নিত করা হয়েছে।

জরিমানা ও কঠোর নির্দেশিকা

গ্রাহকদের ঠকানোর অপরাধে সংশ্লিষ্ট বিস্কুট প্রস্তুতকারী সংস্থাকে অবিলম্বে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেন্ট্রাল কনজিউমার প্রোটেকশন অথরিটি। শুধু আর্থিক জরিমানা হেসেই খালাস নয়, প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মাধ্যম এবং সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে এই ধরনের সমস্ত মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন অবিলম্বে তুলে নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওই সংস্থাকে। বাজার চলতি এই ধরনের প্রতারণা রুখতে কেন্দ্রের এই কঠোর পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *