চোখের সামনে গিলে খেল ত্রিশূলী নদী! এক শিক্ষকের জাদুকরী বুদ্ধিতে কীভাবে রক্ষা পেল ৯০০ পড়ুয়া?

প্রকৃতির নিষ্ঠুর রোষে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত নেপাল। জলপ্রলয়ে কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে দেশটির ৮টি জেলার একাধিক জনবহুল এলাকা। জল, কাদা ও পাথরের এক ভয়াবহ ঢেউয়ে মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেছে বহু জনপদ, যেখানে দোতলা বাড়ির ছাদের ওপর দিয়েও জলের স্রোত বয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। সর্বগ্রাসী এই বিপর্যয়ে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও, সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন প্রায় এক হাজার পড়ুয়া। এক শিক্ষকের অসাধারণ উপস্থিতি বুদ্ধি এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফলেই রক্ষা পেয়েছে ৯০০ শিশুর অমূল্য প্রাণ।

ক্যালেন্ডারের পাতা বলছে শিক্ষক দিবস আসতে এখনও কিছুটা দেরি, কিন্তু নেপালের ত্রিভুবন ত্রিশূলী সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির কল্যাণে গত বুধবারই যেন প্রকৃত শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে গেছে। বিপর্যয়ের সেই ভয়াবহ সকালে স্কুলে উপস্থিত ছিল ৯০০ পড়ুয়া। একদিকে যখন ক্লাসরুমে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে পাঠদান চলছিল, ঠিক তখনই ত্রিশূলী নদী দিয়ে এক অপ্রতিরোধ্য মৃত্যুদূতের মতো ধেয়ে আসছিল ভয়ংকর হড়পা বান।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে প্রথমে স্কুলের হিসাবরক্ষক ছুটে এসে শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদিকে জানান যে ত্রিশূলী উপত্যকার দিকে বিরাট বেগে হড়পা বান এগিয়ে আসছে। এরপর একই সতর্কবার্তা নিয়ে আরও একটি ফোন আসে তাঁর কাছে। খবর পাওয়া মাত্রই আর এক মুহূর্তও নষ্ট করেননি রাজেন্দ্র। তিনি ঠিক করেন, যদি খবরটি ভুলও হয় তবে বড় জোর একদিনের পড়াশোনা নষ্ট হবে, কিন্তু খবর সত্যি হলে ৯০০ শিশুর জীবন চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। এই জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে দেন এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহযোগিতায় সমস্ত পড়ুয়াদের দ্রুত স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

শুধু তাই নয়, স্কুলবাসের চালকদের দ্রুত ফোন করে পড়ুয়াভর্তি বাসগুলিকে ঘুরিয়ে নিরাপদ উচ্চতায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। মর্মান্তিক বিষয় হলো, পড়ুয়াভর্তি একটি স্কুল বাস তার ঠিক পরেই একটি সেতু পার হওয়ার মুহূর্তেই সেটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, ফলে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় বাসভর্তি শিশুরা। চোখের পলকে সেই স্কুল ভবনটি ধ্বংসাবশেষে পরিণত হলেও রাজেন্দ্রবাবুর সাহসিকতায় একটিও তাজা প্রাণহানি ঘটেনি।

নিজের জীবন বাজি রেখে শত শত শিশুকে রক্ষা করা শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি জানান, সেদিন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটাই তিনি নিয়েছিলেন। আজ স্কুলটি ধ্বংস হয়ে গেলেও নেপাল সরকারের কাছে তাঁর একটাই আর্জি, দ্রুত যেন স্কুল বিল্ডিংটি পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হয়। আগামী শিক্ষক দিবসে হয়তো ক্লাসরুম না থাকলেও, এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই আবার যেন তাঁর আদরের পড়ুয়াদের সঙ্গে আনন্দের দিন কাটাতে পারেন—সেটাই তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা। অন্যদিকে, প্রাণে বেঁচে ফেরা এক পড়ুয়া কৃতজ্ঞতার সুরে জানিয়েছে, একমাত্র স্যারের বুদ্ধিমত্তার জন্যই তারা আজ নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে, সুযোগ পেলেই তারা স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *