আটা-দুধ-মাংস কেনার টাকা নেই! চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পাকিস্তানের মানুষ এখন যা খাচ্ছেন, জানলে শিউরে উঠবেন

নিত্যপণ্যের দাম লাগামছাড়াভাবে বেড়ে যাওয়ায় মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির মাসিক বাজেট কার্যত ভেঙে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গীন যে, বেশিরভাগ পরিবারই বাধ্য হয়ে মাংস, দুধ, গম ও চালের মতো প্রধান খাদ্যসামগ্রীর ব্যবহার হু-হু করে কমিয়ে দিচ্ছে। পাক সংবাদপত্র ‘পাকিস্তান টুডে’-র একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই ভয়ংকর অর্থনৈতিক সংকটের চাঞ্চল্যকর চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে।
পাকিস্তান ব্যুরো অফ স্ট্যাটিসটিক্স (PBS)-এর তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ছয় বছরে প্রায় সব প্রধান খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেই পারিবারিক ভোগের মাত্রা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। দেশের গ্রামীণ এবং শহুরে—উভয় অঞ্চলেই এই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। পরিবারগুলি এখন আগের তুলনায় অনেক কম পরিমাণে গম, চাল, মাংস, দুধ এবং চা কিনছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সমস্যা।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ভয়ংকর পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার পরিবারের হার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৫.৯২ শতাংশ থেকে লাফিয়ে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই একই সময়ের মধ্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা’র হার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ২.৩৭ শতাংশ থেকে সোজা ৫.০৪ শতাংশে পৌঁছে গেছে।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে সাধারণ মানুষের খাবার কেনার আসল সামর্থ্য বা ক্রয়ক্ষমতা কতটা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ভালো ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সাধ্য না থাকায় পাকিস্তানি পরিবারগুলিকে তাদের দৈনন্দিন কেনাকাটা এবং খাদ্যের পরিমাণের সঙ্গে প্রতিনিয়ত আপস করতে হচ্ছে।
মৌলিক খাদ্যপণ্যের ব্যবহার হ্রাস ও ব্যতিক্রমী চিত্র
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার বাদ দেওয়ার প্রবণতা পাকিস্তানে এখন স্পষ্ট। শাকসবজি, ফলমূল বা মাছ-মাংসের মতো পুষ্টিকর উপাদানের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি চা পানের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। তবে এই সার্বিক পতনের মাঝেও একটি বিশেষ খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা গেছে—আর তা হলো বনস্পতি ঘি।
পাক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বনস্পতি ঘির মাসিক ব্যবহার ৬৯০ গ্রাম থেকে বেড়ে একলাফে ১.২৫ কেজিতে দাঁড়িয়েছে, যার বৃদ্ধির হার প্রায় ৮১ শতাংশ! বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক বাজেটে মারাত্মক টান পড়ায় মানুষ এখন প্রোটিন বা পুষ্টির তুলনামূলক ব্যয়বহুল উৎস যেমন মাংস ও দুধ কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। তার বদলে কম খরচে বেশি ক্যালোরি মেটানোর জন্য সস্তা বা চর্বিযুক্ত বিকল্পগুলির দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ।
শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই বাড়ছে সংকট
গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যের অভাব প্রকট হলেও এই দুরবস্থা কেবল গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। শহরাঞ্চলের পরিবারগুলির মধ্যেও বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী কেনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যদিও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে সরাসরি অনাহার বা অপুষ্টির সমার্থক হিসেবে দেখা যায় না, তবে এটি নিশ্চিত করে যে মানুষের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার কেনার আর্থিক সংগতি আর নেই।
কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান গত কয়েক বছর ধরে নিট খাদ্য আমদানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ফলে বাজারে পর্যাপ্ত খাবার মজুত থাকলেও সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা না থাকায় সেই খাবার কেনার সুযোগ তারা হারাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সামনে কেবল খাদ্য উৎপাদনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষুধা ও পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধান করা।