কৃষিতে ড্রোনের ব্যবহার কি বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার আরও বাড়িয়ে দেবে? ইইউ-র নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে চাঞ্চল্য!

কৃষিকাজে কৃষিজমি স্প্রে করার জন্য ড্রোন (Drone) ব্যবহারের ওপর থেকে দীর্ঘ কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পথে হাঁটছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)। ‘ওমনিবাস এক্স’ (Omnibus X) নামের নতুন এক আইনি প্যাকেজের মাধ্যমে কৃষিতে ড্রোনের মাধ্যমে কীটনাশক ছড়ানোর অনুমতি দিতে চলেছে ইইউ। তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টি যুগান্তকারী শোনালেও, এর নেপথ্য লুকিয়ে থাকা মারাত্মক বিপদের কথা বলে বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

ড্রোনে কি সত্যিই কীটনাশকের ব্যবহার কমবে?

তাত্ত্বিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, ট্র্যাক্টরের বদলে ড্রোন ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় একদম নিখুঁতভাবে আগাছানাশক বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করা সম্ভব হবে। ফলে সামগ্রিকভাবে রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো যাবে।

তবে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক থমাস ডাউম (Thomas Daum) সতর্ক করে বলেছেন, “শুধু ড্রোন ব্যবহার করলেই কীটনাশক বেঁচে যায় না।” তাঁর মতে, প্রযুক্তির এই নমনীয়তা এবং সহজে স্প্রে করার সুবিধার কারণে কৃষকরা হয়তো আরও বেশি ঘন ঘন কীটনাশক ছড়াতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

গবেষকদের কড়া আপত্তি ও উদ্বেগের কারণ

ইউরোপীয় কাউন্সিলের এই আইনকে ‘ডি-রেগুলেশন প্যাকেজ’ বা নিয়ম শিথিল করার চক্রান্ত বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন গবেষক ও জীববিজ্ঞানীরা। রাইনল্যান্ড-পাফ্জ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী কার্সেন ব্রুহ্ল (Carsten Brühl) জানিয়েছেন, এই আইনের ফলে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অনেক রাসায়নিক পদার্থ বাজারে থেকে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়ে যেতে পারে। যেমন— ক্যানসারের জন্য দায়ী বলে বিতর্কিত আগাছানাশক গ্লাইফোসেট। এছাড়াও কীটনাশক ব্যবহারের লাইসেন্স নবীকরণের নিয়মও সহজ করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

কীটনাশক ছাড়াই কি চাষ সম্ভব?

বিজ্ঞানীদের মতে, ছত্রাকজনিত রোগের ক্ষেত্রে ড্রোন বা লক্ষ্যভিত্তিক স্প্রে সবসময় কার্যকর হয় না, কারণ এগুলো প্রতিরোধমূলকভাবে ব্যবহার করতে হয়। তবে এর বিকল্পও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ‘সাসটেইনেবল ম্যানেজমেন্ট’ বা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (Integrated Pest Management) ওপর জোর দিচ্ছেন। যেখানে ক্ষতিকর কীটনাশকের পরিবর্তে ফসলের চক্র পরিবর্তন, প্রাকৃতিক শিকারী পোকা আকর্ষণ এবং যান্ত্রিক উপায়ে আগাছা দমন করার পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে।

তবে এই পদ্ধতিগুলো সময়সাপেক্ষ হওয়ায় কৃষকরা প্রায়শই সহজ ও সস্তা বিকল্প হিসেবে কীটনাশক ছড়াতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এখন দেখার বিষয়, ইইউ-র এই নতুন প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত কৃষির উন্নয়নে কতটা সহায়ক হয়, নাকি পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: কৃষিতে প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ ও পরিবেশের সুরক্ষা—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *