৬২ টন ত্রাণ পাঠালো ভারত, চিনের বিরুদ্ধে মারাত্মক তথ্য গোপনের অভিযোগ নেপালের!

সকাল সকাল গমগম করছিল নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরংয়ের অভিবাসন দপ্তর। কৈলাস-মানসরোবর যাত্রার নথি যাচাইয়ের লাইনে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ। দৈত্যের মতো ধেয়ে আসা হড়পা বান নিমেষে গিলে খায় আস্ত বহুতল দপ্তরটি। ঘটনার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পরে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছানো চিনা উদ্ধারকারী দল ধ্বংসাবশেষ আর কাদা-পাথরের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পায়নি। নুয়াকোট, ধাদিং, গোর্খা, তানাহুন, চিতওয়ান থেকে নাওয়ালপারাসি—চারপাশের প্রতিটি এলাকায় কেবলই হাহাকার। টানা চারদিনের তল্লাশিতেও মিলছে না স্বস্তি। শনিবার সন্ধে পর্যন্ত সরকারি হিসেবেই মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে পৌঁছেছে ৬৬৯-এ। এর মধ্যে ৩২০ জন ভারতীয়-সহ নিখোঁজের সংখ্যা অন্তত আড়াই হাজার।

কাঠমান্ডুর আপডেট অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত সাড়ে চার হাজার মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শতাধিক। ভোটকোশির এই প্রলয়ঙ্কারী হড়পা বানের ক্ষত সারাতে প্রাথমিক ভাবে অন্তত ৫০০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে বলে জানিয়েছেন নেপালের অর্থমন্ত্রী স্পর্ণিম ওয়াগলে। এই অঙ্ক দেশের মোট অর্থনীতির এক-দশমাংশ। তবে এর মধ্যেই কিছুটা স্বস্তির খবর, বান-বিপর্যয় সামাল দিতে মাত্র তিন দিনে নেপালের পিএম রিলিফ ফান্ডে জমা পড়েছে ২০০ কোটি ডলার। সবচেয়ে বেশি ১,৬২২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে নুয়াকোট থেকে। পাশাপাশি, নেপালের একটি হাইড্রো-পাওয়ার প্লান্ট থেকে চারজন ভারতীয় শ্রমিককে উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

বিপর্যয়ের খবর পাওয়া মাত্রই প্রতিবেশীসুলভ মনোভাব নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লি থেকে ইতিমধ্যে ৬২ টন ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে গিয়েছে নেপালে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে কাঠমান্ডু বিদেশি উদ্ধারকারী দল প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পর, শনিবারই সে দেশে পৌঁছেছে ভারতের বিশেষ রেসকিউ টিম। প্রকৃতির চোখরাঙানি উপেক্ষা করে চলছে জোরকদমে উদ্ধারকাজ। নেপালের ১১টি হাইড্রো-পাওয়ার সাইটের সুড়ঙ্গে এখনও প্রায় ৯০০ শ্রমিক আটকে রয়েছেন। চিনের পাশাপাশি ভারতও সেখানে উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে বলে খবর। এই সংকটের দিনে নয়াদিল্লির পাশে থাকায় ভারতকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পোড়েল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই বিপদ শুধু নেপালের নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশমতো সবরকমভাবে পাশে থাকবে ভারত।

তবে এই ধ্বংসলীলার মাঝেই চরম কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে চিনের ভূমিকা নিয়ে। নেপালের লাংটাং লিরুং থেকে জন্ম নেওয়া এই বিপর্যয় নিয়ে বেজিংয়ের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ শানিয়েছেন নেপালের প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী মাধবপ্রসাদ চৌলাগাইন। তাঁর বিস্ফোরক দাবি, প্রোটোকল থাকা সত্ত্বেও ভয়াবহ হড়পা বান আছড়ে পড়ার বিষয়ে আগাম কোনও সতর্কবার্তাই দেয়নি চিন। তথ্য আদান-প্রদানের অভাব এবং তা গোপন রাখার প্রবণতাকেই এই বিপুল প্রাণহানির জন্য দায়ী করে একে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলে তোপ দেগেছেন তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *