বিচ্ছেদ মানেই কি যৌথ ঋণের অবসান? ডিভোর্সের পর জয়েন্ট হোম লোনের ইএমআই কে দেবেন, জানুন ব্যাঙ্কের কড়া নিয়ম!

বর্তমান সময়ে নিজের ছাদের স্বপ্ন পূরণ করতে স্বামী-স্ত্রীর যৌথভাবে হোম লোন নেওয়ার প্রবণতা বেশ বেড়েছে। দু’জনের আয় একসঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বড় অংকের ঋণ পাওয়া যেমন সহজ হয়, তেমনই প্রতি মাসের ইএমআই-এর (EMI) বোঝাও ভাগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু কোনো কারণে ভবিষ্যতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরলে এবং বিবাহবিচ্ছেদ হলে এই যৌথ ঋণের কী হবে? কে শোধ করবেন বাকি ইএমআই? আর সম্পত্তির আইনি মালিকই বা কে হবেন? এই সমস্ত প্রশ্নই স্বাভাবিকভাবে দম্পতিদের মনে ভিড় করে।
বিচ্ছেদের পরেও ব্যাঙ্ক ছাড় দেয় না:
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালতের মাধ্যমে ডিভোর্স হয়ে গেলেই জয়েন্ট হোম লোনের দায় একসঙ্গে চুকে যায় না। কারণ বিয়ে ভাঙার সঙ্গে ব্যাঙ্কের সঙ্গে করা ঋণচুক্তি বাতিল হয়ে যায় না। লোন সম্পূর্ণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কিংবা ব্যাঙ্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণের কাঠামো পরিবর্তনের বা নাম বাদ দেওয়ার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত মূল চুক্তির শর্তই বহাল থাকে।
ধরা যাক, বিচ্ছেদের পর পারস্পরিক সমঝোতা অনুযায়ী স্বামী বাড়িতে থাকবেন এবং তিনিই একা ইএমআই দেবেন বলে ঠিক হলো। কিন্তু ব্যাঙ্কের নথিতে যদি স্ত্রীর নাম সহ-ঋণগ্রহীতা (Co-applicant) হিসেবে থেকেই যায়, তবে নিজে থেকে স্ত্রীর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। স্বামী হঠাৎ ইএমআই দেওয়া বন্ধ করলে ব্যাঙ্ক কিন্তু আইনগতভাবে অন্য সহ-ঋণগ্রহীতার অর্থাৎ স্ত্রীর কাছ থেকেও বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মালিকানা এবং ঋণের দায়—দুটি আলাদা বিষয়:
আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বাড়ির মালিকানা এবং ঋণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। জয়েন্ট লোনে নাম থাকা মানেই যে সেই সম্পত্তিতে ৫০ শতাংশ আইনি মালিকানা রয়েছে, এমনটা নয়। আবার উল্টোদিকে, বাড়ির মালিক হলেই যে তিনিই একা লোন পরিশোধের জন্য এককভাবে দায়ী থাকবেন, তাও সত্যি নয়। তাই ডিভোর্সের সময়ে সম্পত্তির মালিকানা এবং ঋণের দায়—উভয় দিকই আলাদাভাবে স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিকার কী?
-
লোন নিজের নামে স্থানান্তর: প্রথম পথ হলো, দম্পতির মধ্যে যেকোনো একজন সম্পূর্ণ সম্পত্তি নিজের কাছে রেখে পুরো লোন নিজের নামে ট্রান্সফার করিয়ে নেওয়া। তবে এর জন্য ব্যাঙ্কের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। ব্যাঙ্ক ব্যক্তির আয়, ক্রেডিট স্কোর ও সিভিলের পাশাপাশি ইএমআই পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে তবেই অন্য সহ-ঋণগ্রহীতার নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
-
সম্পত্তি বিক্রি: দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো, যৌথ বাড়িটি বিক্রি করে সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে ব্যাঙ্কের বকেয়া লোন একবারে মিটিয়ে দেওয়া। লোন শোধ করার পর অতিরিক্ত যে টাকা বাঁচবে, তা পারস্পরিক মালিকানার অনুপাতে দু’পক্ষের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।
-
যৌথ মালিকানা বজায় রাখা: কিছু ক্ষেত্রে দু’জন চাইলে যৌথ মালিকানাও বজায় রাখতে পারেন, তবে ইএমআই প্রদান, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, সম্পত্তিকর এবং ভবিষ্যতে বাড়ি বিক্রির মতো সমস্ত শর্ত লিখিতভাবে চুক্তিপত্রে স্পষ্ট থাকা দরকার।
বিশেষ সতর্কতা:
নিছক ব্যক্তিগত বোঝাপড়া বা ডিভোর্স এগ্রিমেন্টের ওপর ভরসা করে বসে থাকবেন না। যেকোনো বড় পদক্ষেপে নামার আগে অবশ্যই ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং লিখিতভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন যে কার নাম লোন অ্যাকাউন্ট থেকে বাদ পড়েছে বা লোন সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে কি না।