ভারতকে চারদিক থেকে ঘেরাও করার ভয়ংকর ছক! মধ্যপ্রাচ্যে গোপন ‘মক্কা চুক্তি’তেই কি শেষ হয়ে যাবে দিল্লির কূটনীতি?

আজকাল পশ্চিম এশীয় কূটনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত এবং উদ্বেগের বিষয় হলো গোপন ও কৌশলগত ‘মক্কা চুক্তি’। গত ৭ই আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সামরিক হামলা হলে তা তিনটি দেশের ওপর হামলা হিসেবেই গণ্য হবে। এটিকে ন্যাটোর ৫ নং অনুচ্ছেদের ‘একজনের ওপর হামলা মানে সকলের ওপর হামলা’-এর অনুরূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটিকে কেবল তিনটি মুসলিম দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এর পরিধির দ্রুত সম্প্রসারণ ভারতের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হয়ে উঠেছে। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থ, বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর এই জোটে ঝোঁক এবং জোটের সদস্য দেশগুলোর সামরিক শক্তি—এই তিনটি বিষয় একত্রে ভারতের জন্য একটি নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক, কেন এই চুক্তিটি ভারতের জন্য একটি বড় বিপদ ডেকে আনছে।

কুয়েতের ধাক্কা ও উপসাগরীয় পরিধি বৃদ্ধি
মক্কা চুক্তি বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ—সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক। তবে তুরস্ক নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে এই কাঠামোটি আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মিশর, কাতার এবং কুয়েতের মতো দেশগুলোর সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা চলছে। আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে: হুথি হামলা মোকাবেলার জন্য গঠিত সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে (এমএমডিসি) ইতোমধ্যেই কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর এবং পাকিস্তান-তুরস্কসহ প্রায় এক ডজন দেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটিকে মক্কা চুক্তির একটি সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর অর্থ হলো, কাগজে-কমপক্ষে তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হলেও এই জোটটি আসলে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং পশ্চিম এশিয়ার একটি বড় অংশকে অন্তর্ভুক্ত করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভারতের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ হলো, এই দেশগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই দীর্ঘদিনের এবং বিশ্বস্ত জ্বালানি-বাণিজ্য অংশীদার। যদি তারা এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে যেখানে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তবে এটি ভারতের উপসাগরীয় নীতির ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে জটিল করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের যোগদান ও দুই দিক থেকে ঘেরাওয়ের আশঙ্কা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো ঘটছে ভারতের নিজস্ব প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ঢাকা মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ “অস্বাভাবিক কিছু হবে না”। যদি পশ্চিমে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ইতিমধ্যেই এই জোটের অংশ হয় এবং পূর্বে বাংলাদেশও এতে যোগ দেয়, তবে ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনার পুরো সমীকরণটাই পাল্টে যেতে পারে। এর ফলে ভারতকে একই সাথে তার পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সীমান্তে চরম কৌশলগত চাপের সম্মুখীন হতে হতে পারে, যা এখন পর্যন্ত মোকাবিলা করা চ্যালেঞ্জগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিপজ্জনক একটি পরিস্থিতি তৈরি করবে।

অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বাণিজ্য সম্পর্কের জটিল সমীকরণ
কৌশলগত ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক এই পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সৌদি আরব ভারতের একটি প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ৪০-৪২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে অপরিশোধিত তেল আমদানির অংশই সবচেয়ে বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তুরস্কের সাথে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০.৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের সঙ্গে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২-১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যদিও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা হ্রাস পেয়েছে। পাকিস্তানের সাথে ভারতের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য বছরের পর বছর ধরে কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এর অর্থ হলো, যে দেশগুলো মক্কা জোটের অংশ বা এতে যোগ দিয়েছে—যে জোটের সাথে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ সবচেয়ে বেশি—তাদের এখন নিরাপত্তা ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পক্ষ নিতে দেখা যাচ্ছে। এটি ভারতের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন করে তুলতে পারে।

জোটের ভয়ঙ্কর সামরিক শক্তি ও ভারতের অবস্থান
এই জোটকে হালকাভাবে না নেওয়ার একটি প্রধান কারণ হলো এতে জড়িত দেশগুলোর সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান। মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অবস্থান সুবিদিত। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ এবং সৌদি আরবের সাথে তাদের ইতিমধ্যেই একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যা এই মক্কা চুক্তিকে আরও বেশি শক্তিশালী করেছে। তৃতীয় অংশীদার হিসেবে তুরস্কের উপস্থিতি এই জোটকে বিশ্বমঞ্চে এক আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে, কারণ দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। এ কারণেই এটিকে একটি “ন্যাটো-ধাঁচের” জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও চুক্তির প্রকাশ্য বিবরণে কোনো দেশকে নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েন করতে বাধ্য করা হয়নি, তবুও তিনটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা, ন্যাটোর সঙ্গে সংযোগ এবং অর্থনৈতিক শক্তির সমন্বয় ভারতের মতো দেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এই বিষয়ে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ না করলেও প্রশ্ন তুলেছেন যে, সদস্য দেশগুলো নিজেরাই অসংখ্য সক্রিয় সামরিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ায় বাস্তবে এই চুক্তি কতটা কার্যকর হবে। তবে এই বহুমুখী অক্ষ যে ভারতের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার একটি বৈধ কারণ জোগায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *