ট্রাম্পের হুমকির মাঝেই মাস্টারস্ট্রোক! আমেরিকা ও চিনকে টেক্কা দিতে কোন নতুন চাল দিচ্ছে ভারত?

আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ট্রেড ডিল নিয়ে আলোচনা চললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত ও চিনের ওপর বারবার মোটা অঙ্কের ট্যারিফ চাপানোর হুমকি দিয়ে চলেছেন। কিন্তু মার্কিন এই রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ট্রাম্পকে চাপে রাখতে এবার এক অভিনব কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাল চালতে চলেছে নয়াদিল্লি ও বেজিং। দুই দেশের এই নতুন বোঝাপড়া বা ফ্রেমওয়ার্ক ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতির গ্লোবাল সাপ্লাই চেন বা জোগান শৃঙ্খলকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

আসছে নতুন বিনিয়োগ ফ্রেমওয়ার্ক: বৈঠকে বসছেন মোদি-জিনপিং

আসন্ন ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে খুব শীঘ্রই ভারত সফরে আসছে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই ঐতিহাসিক সফরের ঠিক আগে ভারত ও চিনের মধ্যে একটি বড় লগ্নির ফ্রেমওয়ার্ক বা বিনিয়োগ কাঠামো তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক মহলের খবর অনুযায়ী, আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেই এই নতুন বিনিয়োগ কাঠামোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে পারে চিন। আর এই সফরে চিনের রাষ্ট্রপ্রধান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার পথে এক বিরাট পদক্ষেপ হতে চলেছে।

উল্লেখ্য, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সাম্প্রতিক বেজিং সফরের হাত ধরেই এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। ২০১৯ সালের পর এটি হতে চলেছে শি জিনপিংয়ের প্রথম ভারত সফর, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বরফ গলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

নতুন বিনিয়োগ ফ্রেমওয়ার্কের মূল লক্ষ্য কী?

ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বাণিজ্য বিনিময় সহজতর করা এবং চিনা বিনিয়োগ বাড়ানোই এই নতুন ফ্রেমওয়ার্কের মূল উদ্দেশ্য। এই কাঠামোর আওতায় সমুদ্রপথে সহজ প্রবেশাধিকারসহ একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে বিওয়াইডি (BYD)-র মতো চিনা বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি ভারতীয় বাজারে আরও সহজে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

পাশাপাশি, তৃতীয় কোনো দেশে সহজে পণ্য রপ্তানি করার জন্য চিনের অর্থায়নে ভারতে একটি বিশেষ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ খাত বা হাব তৈরিরও প্রস্তাব রয়েছে। দীর্ঘ ৬ বছরের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উভয় পক্ষই এখন ধীরে ধীরে পারস্পরিক মতপার্থক্য ভুলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ওপর জোর দিচ্ছে। ভারতও অ-কৌশলগত ক্ষেত্রগুলিতে চিনা বিনিয়োগের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বিবেচনা করছে, যদিও লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (LAC) বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল খাতগুলি কঠোর নিরাপত্তার চাদরেই ঢাকা থাকবে।

ভারতের আসল দাবি ও কৌশল

চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোড়া লাগানোর পাশাপাশি নয়াদিল্লিও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কড়া নজর রাখছে। ভারত চিনের কাছ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি এবং অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল বা লজিস্টিক সরবরাহের ক্ষেত্রে পূর্ণ নির্ভরযোগ্যতার আশ্বাস চাইছে। দুই দেশের মধ্যে চলা বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারত যেমন চিনা বিনিয়োগের মুখাপেক্ষী, তেমনই প্রযুক্তি পণ্য সহ একাধিক ক্ষেত্রে ভারত থেকে চিনে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে, আমেরিকার দ্বিমুখী ট্যারিফ নীতির জাঁতাকলে পড়ে ভারত ও চিনের এই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মেলামেশা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *