অবৈধ বালির কারবার থেকে দেদার তুলছিলেন উৎকোচ! হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলেন খাস থানার কনস্টেবল

অবৈধ বালি পাচারের কারবার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগে এক পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেফতার করল রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখা বা এসিবি (ACB)। ধৃত ওই কনস্টেবলের নাম রতন প্রামাণিক। কনস্টেবলের পাশাপাশি এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিন বালি ব্যবসায়ীর দালাল—শান্তনু বারিক, দীপঙ্কর বারিক এবং রবি বারিককেও গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের সকলের বাড়ি বাঁধগোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের শ্যামসুন্দরপুর গ্রামে। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঝাড়গ্রাম থানা চত্বর থেকেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয় এবং তল্লাশির পর তাঁদের কাছ থেকে মোট ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। গ্রেফতারির পরই কঠোর নিরাপত্তায় তাঁদের কলকাতার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
কীভাবে ফাঁদ পাতে এসিবি?
সূত্রের খবর, বর্ষাকালে নদী থেকে বালি উত্তোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বালি মাফিয়ারা গোপনে নদী থেকে বালি কেটে পাচারের ছক কষেছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, অবৈধভাবে বালি পরিবহণের জন্য প্রতিটি ট্রাক্টরের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তোলা শুরু করে মাফিয়াদের দালালরা। এক ট্রাক্টর মালিক এই অবৈধ extortion বা extortion-এর বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতি দমন শাখার কাছে অভিযোগ জানান। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এসিবি-র আধিকারিকরা বাঁধগোড়ায় হানা দিয়ে প্রথমে রবি ও দীপঙ্করকে আটক করেন। তাঁদের জেরা করেই প্রধান দালাল শান্তনু বারিকের সন্ধান মেলে। পরে শান্তনুর বাড়ি থেকে ট্রাক্টর মালিকদের কাছ থেকে বলপূর্বক আদায় করা ওই বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার করা হয়।
এসিবি আধিকারিকরা তদন্তে জানতে পারেন, অবৈধভাবে সংগৃহীত এই টাকা ঝাড়গ্রাম থানার নির্দিষ্ট এক কনস্টেবলের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল, যাতে নদীর বুক থেকে অবাধে বালি পাচার চালানো যায়। এরপরই পরিকল্পনা করে এসিবি-র আধিকারিকরা বালি ব্যবসায়ী সেজে শান্তনুর সঙ্গে সোজা ঝাড়গ্রাম থানায় প্রবেশ করেন। একটি ব্যাগে ভরা ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা যখন তাঁরা থানার কনস্টেবল রতন প্রামাণিকের হাতে তুলে দেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁকে হাতেনাতে পাকড়াও করেন এসিবি-র গোয়েন্দারা।
থানাতেই দীর্ঘ জেরা ও চাঞ্চল্যকর তথ্য
গ্রেফতারির পর ঝাড়গ্রাম থানার ‘চাইল্ড ফ্রেন্ডলি কর্নার’-এ বসে অভিযুক্ত কনস্টেবল এবং তিন দালালকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেন এসিবি আধিকারিকরা। তদন্তে উঠে এসেছে যে, অভিযুক্ত কনস্টেবল রতন প্রামাণিক ২০১৮ সাল থেকে ঝাড়গ্রাম থানায় কর্মরত বিভিন্ন আইসি-র দেহরক্ষী বা বডিগার্ড হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। খাস থানার অন্দরে বসে পুলিশের উর্দি পরে এই ধরণের অবৈধ বালি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা জেলায়।
উল্লেখ্য, বর্তমান রাজ্য সরকারের আমলে এই নিয়ে ঝাড়গ্রাম জেলায় মোট তিনবার অভিযান চালাল দুর্নীতি দমন শাখা। এর আগে প্রথমবার ঝাড়গ্রামেই এক সরকারি আধিকারিককে ঘুষ নেওয়ার অপরাধে পাকড়াও করেছিল এসিবি। এবার খাস থানার কনস্টেবলের এহেন কুকীর্তি সামনে আসায় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারাও এখন একটাই দাবি তুলছেন—দুর্নীতির বিরুদ্ধে এসিবি-র এই জ্যামিতিক অভিযান যেন লাগাতার জারি থাকে।