“খুচরো থেকে পাইকারি বাজার”—পেঁয়াজের লাগামছাড়া দাম বৃদ্ধিতে মাথায় হাত সাধারণ মানুষের!

দেশজুড়ে এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের হেঁশেলে বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে পেঁয়াজের লাগামছাড়া দাম বৃদ্ধি। এমনিতেই গোটা দেশজুড়ে চিনির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্র সরকারের অন্দরে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও অস্বস্তি বিরাজ করছে, আর তার ঠিক রেশ কাটতে না কাটতেই অগাস্ট মাসের শেষের দিকে এসে তরতর করে বাড়তে শুরু করেছে পেঁয়াজের দর। রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র নাসিক কিংবা দক্ষিণের চেন্নাই—সর্বত্রই পেঁয়াজের বাজারের একই রকম উদ্বেগের চিত্র ধরা পড়েছে। বিশেষ করে মেট্রো শহর কলকাতার বাজারে পেঁয়াজের বর্তমান অবস্থা কেমন, তা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ প্রয়োজন হয়, তার একটা বড় অংশ আসে দেশের অন্যতম প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র নাসিক থেকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নাসিকের বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়লে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কলকাতা সহ সমগ্র রাজ্যজুড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, গত জুলাই মাসের শেষের দিকেও নাসিকে প্রতি কুইন্টাল পেঁয়াজের পাইকারি দর ছিল ২০০০ থেকে ২১০০ টাকার কাছাকাছি। কিন্তু গত এক সপ্তাহের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির জেরে সেই দর একলাফে ৩৬০০ টাকা প্রতি কুইন্টাল পার করে গিয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদনের আঁতুড়ঘরেই চড়া দামে বিক্রি হতে বাধ্য হচ্ছে এই নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজিটি।
নাসিকের এই চড়া দামের আঁচ সরাসরি এসে পড়েছে কলকাতার বাজারেও। শহরের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার শিয়ালদা কোলে মার্কেট থেকে প্রতিদিন কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী শহরতলির বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁয়াজ সরবরাহ করা হয়। সাম্প্রতিক সোম ও মঙ্গলবারের পাইকারি বাজারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান দিনে শিয়ালদার কোলে বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। অথচ মাসখানেক আগেও এই একই পেঁয়াজের পাইকারি দর ছিল মাত্র ১৫ থেকে ২০ টাকার সীমার মধ্যে। অর্থাৎ অত্যন্ত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পাইকারি বাজারেই দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে।
পাইকারি বাজারের পাশাপাশি খুচরো বাজারগুলির অবস্থাও বেশ শোচনীয়। সোমবার রাতে কলকাতার ব্যস্ততম গড়িয়া বাজারে প্রতি কেজি সুখসাগর পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫২ টাকা দরে এবং সাদা পেঁয়াজের দাম ছুঁয়েছে ৫৬ টাকা। অপরদিকে, টালিগঞ্জ বাজার এলাকায় পেঁয়াজের খুচরো দর ঘোরাফেরা করছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকার মধ্যে। শহরের বিমানবন্দর বা এয়ারপোর্ট সংলগ্ন এলাকার খুচরো বাজারেও ছবিটা সম্পূর্ণ এক। মাত্র দশ দিন আগেও যে পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল, সেই একই পেঁয়াজ বর্তমানে কিনতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৪ টাকা প্রতি কেজি দরে।
পেঁয়াজের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রুখতে এবং সাধারণ মানুষের পকেটের টান কমাতে ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছে কেন্দ্র সরকার। দেশজুড়ে পেঁয়াজের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারি বাফার স্টকে সঞ্চিত পেঁয়াজ দ্রুত খোলা বাজারে ছাড়ার ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যে সমস্ত শহরগুলিতে খুচরো পেঁয়াজের দাম বর্তমান জাতীয় গড় দামের তুলনায় অনেকটাই বেশি, সেই অঞ্চলগুলিতে অতিরিক্ত পরিমাণে পেঁয়াজ পাঠানোর ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে পেঁয়াজের জাতীয় গড় দর রয়েছে প্রতি কেজি ৪১.৬৪ টাকা, যার তুলনায় কলকাতার বাজারে দাম অনেকটাই চড়া।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের মোট পাঁচটি প্রধান ভোক্তা কেন্দ্রকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে সরকার। এই শহরগুলির মধ্যে রয়েছে চেন্নাই, মাদুরাই, দিল্লি, কোচি এবং গুয়াহাটি। মূলত নাসিকের পাইকারি বাজার থেকে সরাসরি ট্রেন বা সড়কপথে এই সমস্ত শহরগুলিতে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে বাজারের চাহিদা, জোগানের ভারসাম্য এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে এই কর্মসূচির আওতায় দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।