ভারতে বিপ্লব আনতে আসছে বিএমডব্লিউ! ২০৩০ সালের মধ্যে বিক্রির লক্ষ্য শুনলে চোখ কপালে উঠবে

ভারতের লাক্সারি গাড়ির বাজার ধরতে এবার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং বড়সড় পরিকল্পনা করেছে বিশ্বখ্যাত অটোমোবাইল জায়ান্ট বিএমডব্লিউ (BMW)। সংস্থার লক্ষ্য, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৩০,০০০ বিএমডব্লিউ এবং মিনি (Mini) ব্র্যান্ডের গাড়ি বিক্রি করা। বর্তমান বিক্রির পরিসংখ্যানের তুলনায় এই লক্ষ্যমাত্রা অনেকটাই বেশি এবং উচ্চাভিলাষী। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালে বিএমডব্লিউ ভারতে মোট ১৮,০০১টি লাক্সারি গাড়ি বিক্রি করেছিল। তাই ২০৩০-এর এই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী কয়েক বছরে বিক্রির গতি বহুগুণ বাড়াতে হবে। সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ প্রাক্কলন অনুযায়ী, কেবল ২০২৬ সালের মধ্যেই তাদের মোট বার্ষিক বিক্রি অনায়াসে ২০,০০০ ইউনিটের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাবে।
ইলেকট্রিক গাড়ির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে বিএমডব্লিউ। তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ইভি (EV)-র ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে কোম্পানির মোট বিক্রির প্রায় ৪০ শতাংশই হবে ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক গাড়ি, এমনটাই আশা করছে সংস্থা। অর্থাৎ, ৩০,০০০ গাড়ি বিক্রির লক্ষ্য অর্জিত হলে তার মধ্যে প্রায় ১২,০০০ ইউনিটই হবে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি। ভারতে বিএমডব্লিউ এবং মিনি ব্র্যান্ডের ইলেকট্রিক গাড়ির বিক্রি ইতিমধ্যেই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। বিগত ২০২৫ সালে এই দুটি ব্র্যান্ড একত্রে ৩,৭৫৩টি ইলেকট্রিক গাড়ি বিক্রি করেছিল, যা তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনার নিরিখে প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি। চলতি ২০২৬ সালেও ইভি বিক্রির এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ বজায় রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিএমডব্লিউ-র ইলেকট্রিক গাড়ির বিক্রি একলাফে ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২,৩৫৯ ইউনিটে গিয়ে ঠেকেছে। সংস্থা আশা প্রকাশ করেছে যে, এই বছরের শেষ নাগাদ তাদের মোট বিক্রির অনুপাতে ইলেকট্রিক গাড়ির শেয়ার অনায়াসে ৩০ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে যাবে। ভারতের বাজারে ইলেকট্রিক গাড়ির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তারা নতুন নতুন মডেল বাজারে আনা এবং শক্তিশালী চার্জিং পরিকাঠামো গড়ে তোলার দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
পাশাপাশি, ভারতীয় বিলাসবহুল গাড়ির গ্রাহকদের মধ্যে লং হুইলবেস (LWB) মডেলের চাহিদাও এখন তুঙ্গে, যা বিএমডব্লিউ-র নতুন স্ট্র্যাটেজির একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এই বিশেষ ক্যাটাগরির মডেলে পিছনের সিটের যাত্রীরা পা ছড়িয়ে বসার মতো পর্যাপ্ত অতিরিক্ত জায়গা পান, যার ফলে দেশের অভিজাত ক্রেতাদের কাছে এর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। ২০২৫ সালে বিএমডব্লিউ-র মোট বিক্রির প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল এই লং হুইলবেস মডেল, অথচ ২০২৪ সালে এই হার ছিল মাত্র ২৯ শতাংশ। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এই বিশেষ ক্যাটাগরির শেয়ার আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৫২ শতাংশে পৌঁছেছে। কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট জোরালোভাবে আশাবাদী যে, এই বছরের শেষ হওয়ার আগেই তাদের মোট বিক্রির ৬০ শতাংশেরও বেশি দখল করবে এই লং হুইলবেস মডেলগুলি।
শুধু দেশের প্রথম সারির মেট্রো শহর যেমন দিল্লি বা মুম্বাইয়ের ওপর নির্ভর করে বসে না থেকে, এবার ভারতের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্তরের উদীয়মান শহরগুলোতেও নিজেদের ব্যবসা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএমডব্লিউ। যেখানে প্রধান বড় শহরগুলোতে তাদের বিক্রির বার্ষিক বৃদ্ধির হার মোটামুটি ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, সেখানে ছোট শহরগুলোতে প্রায় ২০ শতাংশেরও বেশি শক্তিশালী বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে সংস্থাটি। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিএমডব্লিউ-র এক্সক্লুসিভ উপস্থিতি রয়েছে। চলতি বছরের শেষেই সেই পরিধি আরও বাড়িয়ে অন্তত ৫০টি শহরে পৌঁছে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তাদের। পন্ডিচেরি, মাইসুরু, হুব্বাল্লি, নাসিক, জলন্ধর, যোধপুর এবং গুয়াহাটির মতো সম্ভাবনাময় শহরগুলোতেও তারা খুব শীঘ্রই তাদের ব্যবসা ব্যাপক হারে বিস্তার করবে।
তবে এই সমস্ত অভাবনীয় সাফল্যের খতিয়ানের মাঝেও বিএমডব্লিউ-র পথচলা সম্পূর্ণ কাঁটামুক্ত নয়। বর্তমান সময়ে টাকার বিনিময় হারের ক্রমাগত ওঠানামা, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচের ঊর্ধ্বগতি তাদের লাভজনকতার ওপর বেশ কিছুটা চাপ সৃষ্টি করছে। ফলস্বরূপ, নিজেদের ব্যবসার ভারসাম্য বজায় রাখতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি, এপ্রিল এবং জুলাই মাসে বিএমডব্লিউ তাদের বিভিন্ন গাড়ির দাম পর্যায়ক্রমে প্রায় ২ শতাংশ করে বৃদ্ধি করেছে। তা সত্ত্বেও ভারতের লাক্সারি ও প্রিমিয়াম গাড়ির বাজারের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ওপর শতভাগ আস্থাশীল এই জার্মান ব্র্যান্ড। মূলত আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়ি, আরামদায়ক লং হুইলবেস মডেল এবং ছোট শহরগুলোতে দিনদিন বাড়তে থাকা গ্রাহক চাহিদাকে শক্ত হাতিয়ার করেই ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৩০,০০০ গাড়ি বিক্রির স্বপ্নের লক্ষে পৌঁছতে চাইছে এই সংস্থা।