ডলার বাতিলের মার্কিন হুঁশিয়ারি! তেহরান কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ যুদ্ধের আগুন জ্বালাতে চলেছে?

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র করতে এবার চরম হুঁশিয়ারি দিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেসব দেশ তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদের আন্তর্জাতিক ডলার-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হতে পারে। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্টের এই মন্তব্যের পরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমেরিকার এই চোখ রাঙানিকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে নারাজ তেহরান। উলটো ওয়াশিংটনকে কড়া ভাষায় পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন চাপের কাছে তাদের কোনো বাণিজ্যিক সহযোগী দেশই মাথা নত করবে না। একইসঙ্গে তেহরানের তেল পরিকাঠামো বা অর্থনীতিতে আঘাত হানার চেষ্টা হলে আমেরিকার জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলিতে ভয়াবহ পাল্টা হামলার চরম হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
ইরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলার লক্ষ্যেই সম্প্রতি নতুন নিষেধাজ্ঞার রূপরেখা ঘোষণা করেছে মার্কিন অর্থ দফতর। যদিও এই মুহূর্তে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ করা হচ্ছে না, তবে মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলির ওপর ডলার নিষেধাজ্ঞা জারির খাঁড়া ঝুলছে। কোন কোন দেশের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিংবা কবে থেকে তা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে চায়নি ওয়াশিংটন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে এই নীতি মেনে চলার জন্য কিছু সময় দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি বিশ্বের প্রায় ৬০ জন ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে নতুন দফার নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছে আমেরিকা। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই কালো তালিকায় চিনের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয়নি। অথচ চিন হলো ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সহযোগী এবং অতীতে বেশ কিছু চিনা ব্যাংক তেহরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তা করেছে বলে জোরালো সন্দেহ রয়েছে মার্কিন গোয়েন্দাদের।
আমেরিকার এই আক্রমণাত্মক ঘোষণার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ সোশ্যাল মিডিয়ায় এক কড়া বার্তায় লিখেছেন যে, আমেরিকার এই ফাঁকা হুমকি এখন আর বিশ্ববাসী বিশ্বাস করে না। অন্যান্য সার্বভৌম দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত করার মতো অর্থনৈতিক শক্তি এই মুহূর্তে আমেরিকার নেই বলেও কটাক্ষ করেছেন তিনি। গালিবাফের দাবি, ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদাররা কূটনৈতিক ও প্রকাশ্য বার্তার মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা আমেরিকার এসব হুমকিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিচ্ছে না।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছেন ইরানের অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিজাদেহ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করার মতো সমস্ত প্রস্তুতি তেহরানের হাতে রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, তাদের হাতেও এমন কৌশল ও অস্ত্র রয়েছে যা খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ইরানের বর্তমান প্রতিরক্ষা কৌশল আর কেবল আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই উল্লেখ করে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, শত্রু দেশগুলোকে এবার যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। চিন বা রাশিয়া কেউই আমেরিকার এই একতরফা সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশও মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে বলে তেহরানের জোরালো বিশ্বাস।
গত প্রায় ছয় মাস ধরে আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যকার অদৃশ্য সংঘর্ষ বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। যদিও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি কোনো বড় ধরনের সামরিক হামলার খবর পাওয়া যায়নি, তবুও দীর্ঘমেয়াদী কোনো কূটনৈতিক সমাধানের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনও তৈরি হয়নি। এই চলমান উত্তেজনার জেরে ইতিমধ্যেই ইরানের ঐতিহ্যবাহী সামরিক শক্তির একটা বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। তা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে আঘাত হানার এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে নিখুঁত মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানোর মতো ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা তেহরানের হাতে এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, ইরানের গোপন পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করার প্রধান এজেন্ডা নিয়ে অবিচল রয়েছে আমেরিকা ও ইজরায়েল। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যেকোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।