মারাঠি না বলতে পারলেই বাতিল হবে অটো-ট্যাক্সির রেজিস্ট্রেশন! চরম বিক্ষোভে অচল মুম্বই

দশকের পর দশক ধরে ভারতের বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ের যাতায়াত ব্যবস্থার প্রধান অঙ্গ হয়ে উঠেছে এই শহরের ঐতিহ্যবাহী কালো-হলুদ ট্যাক্সি এবং অটোরিকশা। সকালের অফিস টাইমের চরম ব্যস্ততা থেকে শুরু করে গভীর রাতের জরুরি যাতায়াত—সবক্ষেত্রেই এই বাহনগুলি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। কিন্তু গত ২১ আগস্ট থেকে মহারাষ্ট্রের এই চেনা চিত্রে হঠাৎ করেই এক বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কারণ, রাজ্য সরকারের পরিবহন দফতরের (RTO) আধিকারিকরা এখন পরীক্ষা করতে শুরু করেছেন যে বাণিজ্যিক গাড়ির চালকরা ঠিকঠাক মারাঠি বলতে পারছেন কি না। আর এই নতুন নিয়ম চালু হওয়ার পরেই মুম্বইয়ের পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক বিতর্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, দক্ষিণ মুম্বই থেকে শুরু করে শহরের উত্তর প্রান্তের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় প্রশাসনের এই বিশেষ পরীক্ষা অভিযান চলছে। যে সমস্ত চালক সাবলীলভাবে মারাঠি বলতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তাঁদের তৎক্ষণাৎ সরকারি ‘মেমো’ ধরানো হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, এই নোটিশ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে চালকদের ফের পরীক্ষায় বসতে হবে। সেই দ্বিতীয় দফার পরীক্ষায় যদি তাঁরা আবারও ব্যর্থ হন, তবে পরবর্তী তিন মাসের জন্য তাঁদের ট্যাক্সি বা অটো চালানোর রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওয়া হতে পারে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত চালকদের বাধ্যতামূলকভাবে মারাঠি ভাষায় কয়েকটি প্রয়োজনীয় বাক্য শিখে নিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি নির্দেশিকায় এমনটাই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রে মারাঠি ভাষায় কয়েকটি সাধারণ বাক্য শেখা খুব একটা কঠিন কাজ না হলেও, আসল সমস্যা তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়। চালকদের মূল অভিযোগ, আরটিও আধিকারিকরা পরীক্ষার সময় এমন সব জটিল প্রশ্ন করছেন, যা তাঁদের অফিশিয়াল ট্রেনিংয়ের নির্দিষ্ট ‘সিলেবাসের বাইরে’। মাথায় রাখতে হবে যে, প্রশাসনের এই কড়া অভিযান আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। তবে এর জেরে ইতিমধ্যেই চালকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছে এবং তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ শুরু হয়ে গিয়েছে। মহারাষ্ট্র সরকারের এই নতুন মারাঠি ভাষার কঠোর নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গত সোমবার সন্ধ্যা থেকেই মুম্বইয়ের একাংশের অটোরিকশা ও ট্যাক্সি চালকরা তিন দিনের লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন।
গত শুক্রবার থেকেই মুম্বইয়ের রাস্তায় অটো এবং ট্যাক্সির মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করে। ক্ষুব্ধ যাত্রীদের অনেকেরই অভিযোগ, একটি অটো বা ক্যাব পাওয়ার জন্য তাঁদের দীর্ঘ ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পর্যন্ত রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর জেরে বহু সাধারণ চাকুরিজীবী ও স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে মারাত্মক সমস্যা পোহাতে হয়েছে এবং অনেকেই দেরিতে অফিসে পৌঁছেছেন। চালকদের বক্তব্য, এই প্রতিযোগিতার বাজারে এমনিতেই দিনরাত পরিশ্রম করে তাঁদের দুবেলা অন্নসংস্থান করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার ওপর ভাষার এই নতুন নিয়ম তাঁদের জীবনযাত্রাকে আরও বেশি অনিশ্চিত করে তুলছে।
সোমবার কাঞ্জুরমার্গ ও কান্দিভলি সহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুব্ধ অটো ও ট্যাক্সি চালকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান এবং রাস্তা অবরোধ করেন। তাঁদের তীব্র অভিযোগ, মারাঠি ভাষার এই নিয়ম কার্যকর করতে গিয়ে ভাষাটি ভালোভাবে না জানা সাধারণ চালকদের অকারণে হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। ‘ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটাল’-এর সঙ্গে কথা বলা বেশ কয়েকজন ক্যাব চালক জানিয়েছেন যে তাঁরা স্বেচ্ছায় মারাঠি ভাষা শিখতে আগ্রহী, কিন্তু আধিকারিকরা পরীক্ষার নামে এমন সব অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তুলছেন যা তাঁদের প্রশিক্ষণ পর্বে কখনও শেখানোই হয়নি।
উল্লেখ্য, এই নতুন এবং কড়া নিয়মটি শুধুমাত্র সাধারণ ট্যাক্সি ও অটো চালকদের ক্ষেত্রেই নয়, বরং ওলা এবং উবারের মতো জনপ্রিয় অ্যাপ-নির্ভর ক্যাব পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত চালকদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ১৯৮৯ সালের মহারাষ্ট্র মোটর ভেহিকেল রুলস সংশোধন করে মহারাষ্ট্র সরকার বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী গাড়ির চালকদের জন্য মারাঠি ভাষা জানা বাধ্যতামূলক করেছে। গত ২০ আগস্ট থেকে এই নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করার বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। তবে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সোমবার মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস সাফ জানিয়েছেন, “আমরা ভিনরাজ্য থেকে আসা হিন্দিভাষী ভাইদের মারাঠি ভাষার বিশেষজ্ঞ বানাতে চাইছি না, তবে শহরের সুরক্ষার স্বার্থে তাঁদের ন্যূনতম ভাষাটির জ্ঞান থাকা উচিত। ভাষা শেখার নির্দিষ্ট সময়সীমা ইতিমধ্যেই তিনবার বাড়ানো হয়েছে। আমাদের সরকার ভাষার ভিত্তিতে কোনো রকম অবিচার হতে দেবে না।”
এদিকে সোমবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনের এই টানা অটো-ট্যাক্সি ধর্মঘটের জেরে মুম্বইয়ের ব্যস্ত রাস্তায় তীব্র ক্ষোভ এবং জনদুর্ভোগ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এরই মধ্যে প্রবল বৃষ্টির কারণে শহরের স্বাভাবিক যান চলাচল এমনিতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ, অটো-ট্যাক্সি চালকদের এই আকস্মিক ধর্মঘট সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং গোটা মহানগরীর স্বাভাবিক ছন্দ সাময়িক থমকে গেছে।