কোন কোন বাড়িতে বন্ধ হবে LPG সিলিন্ডার দেওয়া? জানুন কেন্দ্রের নতুন নির্দেশিকা

রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে এবার এক বড়সড় ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের যে সমস্ত এলাকায় ইতিমধ্যেই পাইপলাইনের মাধ্যমে পিএনজি (PNG) পৌঁছে গিয়েছে, সেখানে এবার এলপিজি (LPG) সিলিন্ডারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের পক্ষ থেকে দেশের সমস্ত রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে এই মর্মে বিশেষ নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। মোদী সরকারের এই নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো—একদিকে যেমন ক্রমবর্ধমান এলপিজির উপর থেকে ভরতুকি ও চাপের বোঝা কমানো, তেমনই অন্যদিকে দেশজুড়ে পাইপলাইন গ্যাসের পরিকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করা।
তবে এই বিষয়টি বর্তমানে কেবল সাধারণ পরামর্শ বা অনুরোধের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে জারি করা সংশোধিত এলপিজি সংক্রান্ত নির্দেশিকায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যে সমস্ত গ্রাহকদের বাড়িতে ইতিমধ্যেই পিএনজি সংযোগ রয়েছে, তাঁরা আর একই সঙ্গে গার্হস্থ্য এলপিজি সংযোগ রেখে নিয়মিত এলপিজি সিলিন্ডার রিফিল নিতে পারবেন না। এই ধরনের সংযোগধারীদের নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থেকে তাদের এলপিজি সংযোগ বাধ্যতামূলকভাবে সমর্পণ করতে হবে। সরকারের সাম্প্রতিক এই নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট বাড়িতে ইতিমধ্যেই যদি পাইপলাইন গ্যাস বা পিএনজি সংযোগ পৌঁছে যায় এবং তা যদি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়, তবে সমান্তরালভাবে এলপিজি সিলিন্ডার চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকছে না।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের ২৫ মে ২০২৬-এর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে, পিএনজি সংযোগ নেওয়ার পর সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে এলপিজি সংযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। অথবা বিকল্প হিসেবে, ভবিষ্যতে পিএনজি সংযোগ নেই এমন কোনো এলাকায় ব্যবহারের জন্য এলপিজি সংযোগের ট্রান্সফার ভাউচার নেওয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, পাইপলাইনের গ্যাস পাওয়ার পর বাড়িতে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে যাওয়ার পুরোনো অভ্যাস বজায় রাখার পরিবর্তে গ্রাহকদের এখন থেকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তাদের অতিরিক্ত এলপিজি সংযোগ সমর্পণ করতেই হবে।
যে সমস্ত এলাকায় পিএনজি পরিকাঠামো বা পাইপলাইন ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে, সেখানকার সাধারণ মানুষের জন্য কী ধরনের পরিবর্তন আসছে? পেট্রলিয়াম মন্ত্রক দেশের সমস্ত রাজ্য সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা (OMC) এবং সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (CGD) সংস্থাগুলিকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে। বলা হয়েছে যে, অবিলম্বে এমন গ্রাহকদের চিহ্নিত করতে হবে, যাঁদের এলাকায় সমস্ত পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এখনও পিএনজি সংযোগ না নিয়ে ঐতিহ্যবাহী এলপিজি ব্যবহার করে চলেছেন। চিহ্নিত করার পর ওই সমস্ত গ্রাহকদের বিশেষ নোটিস দিয়ে পিএনজি পরিষেবা গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে।
অবশ্য এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন—শুধুমাত্র কোনো এলাকায় পাইপলাইন গ্যাস বা পিএনজি পৌঁছে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে জবরদস্তি বা রাতারাতি কোনো ইউজারের এলপিজি সংযোগ কেটে দেওয়া হবে না। সরকারি নির্দেশিকায় খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় পিএনজি সংযোগ গ্রহণ এবং তার পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের এলপিজি সংযোগ বাতিলের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
কেন হঠাৎ করে এলপিজি থেকে পাইপলাইন গ্যাসের ওপর এই ব্যাপক জোর দিচ্ছে কেন্দ্র? এর নেপথ্যে রয়েছে ভারতের জ্বালানি সরবরাহের ওপর লাগাতার চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। বিগত দিনে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী ঘিরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। সেই পরিস্থিতিতে ভারতও এলপিজি সরবরাহের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা ও অন্যান্য বাধা সামাল দিতে একাধিক জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
কেন্দ্রীয় সরকার একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ বাজারে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তেমনই সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পাইপলাইন গ্যাস বা পিএনজির পরিকাঠামো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দেশের প্রতিটি কোণায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকারের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনাতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যে সমস্ত গ্রাহক ইতিমধ্যেই পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পাচ্ছেন, তাঁদের এলপিজি সংযোগ সমর্পণ করানোর এই পদক্ষেপটি মূলত সামগ্রিক চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান কমাতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
দেশের প্রতিটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় পাইপলাইন গ্যাস বা পিএনজি ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও নির্বিঘ্নে সম্প্রসারণ করতে কেন্দ্র সরকার গত ২৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে ‘ন্যাচারাল গ্যাস অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টস ডিস্ট্রিবিউশন অর্ডার, ২০২৬’ জারি করেছে। এই নতুন আদেশের মাধ্যমে পাইপলাইন বসানোর দীর্ঘসূত্রিতা কমানো হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন এবং জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা অনেকটাই দূর করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিকাঠামো নির্মাণের পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ আবাসিক এলাকাগুলিতেও পিএনজি নেটওয়ার্ক খুব কম সময়ের মধ্যে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে পিএনজি সংযোগের সংখ্যা দেশজুড়ে রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পরবর্তী সময়েও লাগাতার নতুন সংযোগ প্রদানের কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে সফল করতে তৈরি করা হচ্ছে শক্তিশালী জেলাস্তরের সমন্বয় ব্যবস্থা। পিএনজি পরিকাঠামো সম্প্রসারণের কাজটিকে আরও বেশি গতিশীল করতে রাজ্য প্রশাসন, তেল বিপণন সংস্থা এবং সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন সংস্থাগুলির পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, জেলা স্তরেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিকদের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়মিতভাবে নজরদারি করার কঠোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে যে সমস্ত এলাকায় ইতিমধ্যেই পিএনজির পর্যাপ্ত পরিকাঠামো মজুত রয়েছে, সেখান থেকে খুব দ্রুত এলপিজি ব্যবহারকারীদের ধাপে ধাপে পিএনজি নেটওয়ার্কে সফলভাবে স্থানান্তরিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে ওয়াকিবহাল মহল।