প্রতিদিন তৈরি হয় দেড় লক্ষ ল্যাংচা! বিক্রি না হলে এত মিষ্টি কোথায় যায়? জানলে চমকে উঠবেন

দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যাতায়াত করেন অথচ শক্তিগড়ের ল্যাংচা খাননি, এমন খাদ্যরসিক বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। জাতীয় সড়কের দুই ধারে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিয়েনে ছানা ভাজার গন্ধে ম ম করে পুরো এলাকা। হিসেব অনুযায়ী, শক্তিগড় ল্যাংচা-হাবে প্রতিদিন গড়ে ১ থেকে ১.৫ লক্ষ ল্যাংচা তৈরি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ দিনে কি সত্যিই এত মিষ্টি বিক্রি হয়? বিক্রি না হলে সেই হাজার হাজার ল্যাংচার শেষ পর্যন্ত কী হয়? ডাস্টবিনে কি চলে যায়?
আসলে শক্তিগড়ের দোকানদারদের ব্যবসায়িক বুদ্ধি আর বিশেষ কৌশলের কারণে একটা ল্যাংচাও নষ্ট হয় না, বরং সেখান থেকেই দ্বিগুণ লাভ তুলে নেন ব্যবসায়ীরা।
কেন ল্যাংচা সহজে নষ্ট হয় না? অন্যান্য রসের মিষ্টির মতো ল্যাংচা খুব দ্রুত নষ্ট হয় না। কারণ এটি প্রথমে ছানা, ময়দা ও খোয়া দিয়ে মেখে ডুবো তেলে ভাজা হয় এবং তারপর ঘন চিনির রসে ডোবানো হয়। তাই বাইরের খোলা বাতাসে ৩-৪ দিন এবং ফ্রিজে ৭-৮ দিন পর্যন্ত অনায়াসে ভালো থাকে। তাই একদিন বিক্রি না হলে তা ফেলে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
বইবিক্রি না হওয়া ল্যাংচা নিয়ে কী করা হয়? জানুন ৩টি গোপন কৌশল:
১. রিসাইকেল ফর্মুলা (পুরোনো থেকেই নতুন): এটি শক্তিগড়ের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক কৌশল। আগের দিনের ল্যাংচা থেকে ভালো করে রস ঝরিয়ে নিয়ে সেটিকে হাত দিয়ে ভেঙে গুঁড়ো করা হয়। এরপর নতুন ছানা ও খোয়ার সঙ্গে সেই গুঁড়ো মিশিয়ে ফের ল্যাংচা তৈরি করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে ল্যাংচা আরও বেশি খাস্তা ও সুস্বাদু হয় এবং ক্রেতারা তা বুঝতেই পারেন না।
২. অন্যান্য মিষ্টি তৈরি: দুই-তিন দিনের বেশি পুরনো ল্যাংচা দিয়ে আর ল্যাংচা তৈরি করা হয় না। সেগুলিকে গুঁড়ো করে কালোজাম, পান্তুয়া, চমচমের ভেতরের পুর, লেডিকেনি এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘ল্যাংচার পায়েস’ তৈরি করা হয়। এমনকি বহু দোকানে এই গুঁড়ো দিয়ে ‘ল্যাংচা সন্দেশ’ও বিক্রি করা হয়।
৩. রাত ৯টার পর পাইকারি ধামাকা অফার: প্রতি সন্ধ্যায় শক্তিগড়ে শুরু হয় অন্য ব্যবসা। রাত ৮টার পর জাতীয় সড়কের ধারের ছোট হকার, বাসের খালাসি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আসেন। তখন ২০০ টাকা কেজির ল্যাংচা পাইকারি দরে ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। এছাড়া দোকানকর্মী ও স্থানীয় গরিব মানুষদের মধ্যেও তা বিলিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ল্যাংচা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে শূন্য।
ল্যাংচার আসল ইতিহাস: অনেকেরই ধারণা ল্যাংচা শক্তিগড়ের নিজস্ব আবিষ্কার। কিন্তু এর আসল জন্মস্থান নদীয়ার কৃষ্ণনগর। কথিত আছে, কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়ির এক খোঁড়া বা ল্যাংচা ময়রা প্রথম এই মিষ্টি তৈরি করেছিলেন, যাঁর নামানুসারে এর নাম হয় ‘ল্যাংচা’। পরবর্তীতে বর্ধমানের রাজার কন্যার বিয়ের সূত্রে শক্তিগড়ে আসেন সেই ময়রা, আর তখন থেকেই শক্তিগড় হয়ে ওঠে বাংলার ল্যাংচার রাজধানী।