টাকা ডাবল করার নেশায় সর্বস্বান্ত! এফঅ্যান্ডও ট্রেডিংয়ে খুচরো বিনিয়োগকারীদের ৯১ হাজার কোটি টাকা উধাও

শেয়ার বাজারে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ফিউচার অ্যান্ড অপশন্স (F&O) ট্রেডিং যে আসলে কতটা সর্বনাশা, তা আরও একবার হাড়ে হাড়ে প্রমাণ করে দিল বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI)। সম্প্রতি প্রকাশিত সেবির এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দেশের প্রায় ৮৭.৭ শতাংশ খুচরো লগ্নিকারী ইকুইটি ডেরিভেটিভস সেগমেন্টে (EDS) নিজেদের কষ্টের সঞ্চয় খুইয়েছেন। সব মিলিয়ে এই লগ্নিকারীদের মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯১,৬৮৫ কোটি টাকা।

বিপুল ক্ষতির ধাক্কা এবং মাথাপিছু হিসেব
সেবির অর্থনীতি ও নীতি বিশ্লেষণ বিভাগ (DEPA)-র তৈরি এই সমীক্ষা রিপোর্টটি তৈরি হয়েছে দেশের শীর্ষ ১৫টি ব্রোকারের তথ্যের ভিত্তিতে, যা সামগ্রিক খুচরো লগ্নিকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

এর আগের অর্থবর্ষে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে যেখানে মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১.১২ লক্ষ কোটি টাকা, সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৫-২৬ সালে তা সামান্য কমে ৯১,৬৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে মোট ক্ষতির অঙ্ক কিছুটা কমলেও, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর অনুপাত প্রায় একই জায়গায় রয়েছে। উল্টে মাথাপিছু গড় ক্ষতির পরিমাণ সামান্য বেড়ে প্রায় ১.১৭ লক্ষ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

বিপদ বুঝে সরে দাঁড়াচ্ছেন অনেকেই
এই লাগাতার লোকসানের জেরে একটা ইতিবাচক পরিবর্তনও লক্ষ্য করা গেছে—ঝুঁকি বুঝতে পেরে অনেকেই এই বাজার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। যেখানে ২০২৪-২৫ সালে সক্রিয় খুচরো লগ্নিকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৮.১ লক্ষ, সেখানে পরবর্তী অর্থবর্ষে তা প্রায় ২০ শতাংশ কমে নেমে এসেছে ৭৮.৬ লক্ষে। শুধু তাই নয়, নতুন করে F&O ট্রেডিংয়ে পা রাখা নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেবির ধারাবাহিক কড়াকড়ি এবং একের পর এক বড় লোকসানের খবর প্রকাশ্যে আসার ফলেই এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে।

সাধারণ মানুষের পকেট কেটে লাভবান কারা?
সেবির রিপোর্টে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, খুচরো বিনিয়োগকারীদের এই মোট ক্ষতির প্রায় ৯২ শতাংশই এসেছে অপশন্স ট্রেডিং থেকে। সাধারণ মানুষ যখন হু হু করে টাকা খোয়াচ্ছেন, সেই সুযোগেই ফায়দা তুলছে বড় শক্তিগুলি। প্রপ্রাইটরি ট্রেডাররা এই বাজার থেকে প্রায় ৪৪,০০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যেখানে বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থা বা FPI-এর পকেটে ঢুকেছে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকা।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিশাল মুনাফার প্রায় ৯৯ শতাংশই এসেছে ‘অ্যালগো’ বা কম্পিউটার-চালিত উন্নত ট্রেডিং ব্যবস্থার হাত ধরে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি, অ্যালগরিদম এবং বিপুল পুঁজির এই লড়াইয়ে সাধারণ খুচরো লগ্নিকারীরা যে কার্যত টিকতেই পারছেন না, তা সেবির পরিসংখ্যানে জলের মতো স্পষ্ট।

লেনদেন খরচের পাহাড়প্রমাণ বোঝা
শুধু ট্রেডিংয়ে লোকসানই নয়, এর পাশাপাশি লেনদেন খরচ বাবদও খুচরো বিনিয়োগকারীদের গুনতে হয়েছে প্রায় ২৫,০০০ কোটি টাকা। বিগত পাঁচ বছরে (২০২২-২৬) শুধু এই আনুষঙ্গিক খরচের অঙ্ক পৌঁছে গেছে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকায়। সব মিলিয়ে সেবির এই পরিসংখ্যান ফের একবার হুশিয়ার করে দিল যে, ফিউচার অ্যান্ড অপশন্স ট্রেডিং কোনো সহজ আয়ের পথ নয়, বরং এটি বড় পুঁজি ও নিখুঁত কৌশলের এক কঠিন লড়াই, যেখানে সাধারণ মানুষের সর্বস্বান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *