কালো বিড়াল সামনে এলেই অশুভ শক্তি ভর করে? বিজ্ঞান ও ইতিহাসের পাতা উল্টালে চোখ কপালে উঠবে!

স্কুটার কিংবা গাড়িতে কোথাও যাওয়ার সময় হঠাৎ যদি একটি কালো বিড়াল রাস্তা পার হয়, তবে আপনাদের মধ্যেও কি কেউ কেউ গাড়ি থামিয়ে দেন? কিংবা অন্য কোনো গাড়ি আগে পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন? ভারতের বহু মানুষের কাছেই এটি অত্যন্ত পরিচিত এবং নিত্যদিনের এক অভ্যাস। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এর পেছনে কি আদতে কোনো জোরালো যুক্তি রয়েছে, নাকি এটি শতাব্দীপ্রাচীন এক নিছক কুসংস্কার?
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কালো বিড়ালকে অশুভ বা অপছন্দের প্রতীক ভাবার এই ধারণাটির উৎপত্তি ভারতে নয়। এর মূল শিকড় জড়িয়ে রয়েছে মধ্যযুগীয় ইউরোপের ইতিহাস ও লোককথায়। সেসময়ে সমাজে অন্ধবিশ্বাস ছিল যে, ডাইনি বা তান্ত্রিকরা রাত্রের অন্ধকারে বিড়ালের রূপ ধারণ করে ঘুরে বেড়ায়। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক প্রভাব এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির আদান-প্রদানের মাধ্যমেই এই কুসংস্কার ভারতীয় সমাজে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় কিছু অন্ধবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে যায়।
অন্যদিকে, ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র বা ব্যবহারিক প্রেক্ষাপট অন্য কথা বলে। প্রাচীনকালে ভারতে বিড়ালকে কখনোই অশুভ বা শয়তানের রূপ হিসেবে দেখা হতো না, বরং এটি ছিল দিক ও সময়ের প্রতীক। অতীতে যখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল ঘোড়ার গাড়ি, তখন রাতের অন্ধকারে বা জঙ্গলের রাস্তায় বন্য প্রাণীদের চোখ জ্বলজ্বল করলে ঘোড়া ভয় পেয়ে চমকে উঠত, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। সেই সময় দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য পথচলতি মানুষকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যাওয়ার এক ব্যবহারিক নিয়ম বা সতর্কতা শিখিয়েছিলেন মুরুব্বিরা। সময়ের সঙ্গে সেই সচেতনতামূলক অভ্যাসই ধীরে ধীরে আজকের দিনে ‘অশুভ বার্তা’ বা কুসংস্কারে রূপ নিয়েছে।
মজার বিষয় হলো, বিশ্বের সব দেশেই কিন্তু কালো বিড়ালকে নিয়ে এমন নেতিবাচক ধারণা নেই। যেমন—জাপানি সংস্কৃতিতে কালো বিড়াল রাস্তা পার হওয়া অত্যন্ত শুভ সংকেত ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। স্কটল্যান্ডে বাড়ির দরজায় কালো বিড়ালের আগমন মানেই ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির বার্তা। আবার প্রাচীন মিশরে বিড়ালকে দেবী ‘বাস্তেত’-এর রূপ হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও পুজো করা হতো।
বিজ্ঞান অবশ্য এই ধরনের সমস্ত ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবৈজ্ঞানিক বলে উড়িয়ে দিয়েছে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় এটিকে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা ভ্রান্তি বলা হয়—অর্থাৎ, বিড়াল রাস্তা পার হওয়ার পর জীবনে কোনো খারাপ ঘটনা ঘটলে মানুষ অবচেতনভাবেই দুটিকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে, যা আদতে সম্পূর্ণ কাকতালীয়। প্রকৃতপক্ষে, বিড়াল নিজের স্বভাবসুলভ উপায়ে নিজের গন্তব্যে হেঁটে চলে। তাই শুভ বা অশুভ ভাগ্য কোনোদিন কোনো প্রাণীর পায়ে নির্ভর করে না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।