শুধু রান্নাবান্না বা ২৪ ঘণ্টা বাড়িতে থাকাই কি কাজ? হোমমেকার নিয়ে ঐতিহাসিক রায় আদালতের

পরিবার সামলানোর দায়িত্ব কি কেবল কম শিক্ষিত বা যাঁরা চাকরি করেন না, তাঁদেরই? এই প্রচলিত ধারণায় বড়সড় ধাক্কা দিল কর্নাটক হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট বার্তা, শুধুমাত্র নিরক্ষর হওয়া কিংবা সারাদিন বাড়িতে কাটানোই হোমমেকার হওয়ার মাপকাঠি নয়। পরিবারের সেবা, ত্যাগের মানসিকতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় একজন প্রকৃত হোমমেকার। শুধু তাই নয়, আদালত জানিয়েছে যে এই শব্দটি সম্পূর্ণ লিঙ্গ-নিরপেক্ষ; অর্থাৎ পুরুষ বা নারী—উভয়েই হতে পারেন হোমমেকার।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৩ সালে। বায়োটেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এক ২৫ বছরের তরুণী পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। অতীতে কিছুদিন গেস্ট লেকচারার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও দুর্ঘটনার সময় তিনি কর্মরতা ছিলেন না। এই দুর্ঘটনায় তাঁর স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। ভবিষ্যতে আর উপার্জন করতে পারবেন না—এই যুক্তিতে তিনি কর্নাটক স্টেট রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন।
পরিবহন সংস্থার তরফ থেকে পালটা যুক্তি দেওয়া হয়, ওই মহিলা উচ্চশিক্ষিত এবং ঘটনার সময় তিনি কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাই তাঁকে ‘হোমমেকার’ হিসেবে গণ্য করা যায় না এবং কোনো ক্ষতিপূরণও তাঁর প্রাপ্য নয়। মোটর অ্যাক্সিডেন্ট ক্লেমস ট্রাইব্যুনালও তাঁর আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর ২০১৮ সালে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন ওই মহিলা। তিনি জানান, শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি এখন শুধু পরিবারের দেখভালই করছেন, তাই তাঁকে হোমমেকার হিসেবে ধরেই যেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি চিল্লাকুর সুমলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ডিগ্রি যাই থাকুক না কেন, যে মহিলারা পরিবারের দেখভাল করেন এবং পরিবারের খুশির কথা ভাবেন, তাঁরা প্রত্যেকেই হোমমেকার। কর্মরত মহিলারাও নিজেদের সংসার সামলানোর সুবাদে এই পরিচয়ের দাবিদার। এমনকি পুরুষরাও হোমমেকার হতে পারেন। বিচারপতির মতে, যিনি পরিবারের সুখে-দুঃখে স্তম্ভ হয়ে পাশে থাকেন এবং নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন, তিনিই আসল হোমমেকার।
সবপক্ষের সওয়াল ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ওই মহিলাকে হোমমেকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কর্নাটক হাইকোর্ট। তাঁর বয়স এবং ১০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কথা মাথায় রেখে প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্যের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি, আর্থিক ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ লক্ষ ৭২ হাজার ৮০০ টাকা এবং চিকিৎসা চলাকালীন পরিবার যে পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তার জন্য অতিরিক্ত ২৪ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনি লড়াইয়ের এই রায় গৃহিণীদের সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক তৈরি করল।