৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্ত ৩৩৮ জঙ্গি! কারামুক্ত উগ্রপন্থীদের তৎপরতা ও জাতিসংঘের বিস্ফোরক প্রতিবেদনে বাড়ছে উদ্বেগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বিভিন্ন উগ্রপন্থী ও নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন। কারা কর্তৃপক্ষ ও আদালতের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কারাগারে আটক থাকা অন্তত ৩৩৮ জন ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। একই সঙ্গে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া এবং পলাতক বন্দিদের বড় একটি অংশের এখনও সন্ধান না মেলায় দেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
বিপজ্জনক জঙ্গিদের কারামুক্তি ও নিখোঁজ রহস্য
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ২৪০ জন বন্দি পালিয়েছিলেন। যদিও সিংহভাগকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, তবে এখনও প্রায় ৬৯০ জন বন্দির কোনো খোঁজ নেই। এর মধ্যে অন্তত ৯ জন জঙ্গিবাদের মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে ৬ জনকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা গেলেও বাকি ৩ জনের খোঁজ নেই। বিশেষ করে নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ৯৮ জন জঙ্গির মধ্যে ৭০ জনই সাজাপ্রাপ্ত এবং তাদের মধ্যে ২৭ জনকে এখনও পর্যন্ত পাকড়াও করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়া আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের শাখা (একিউআইএস)-এর সঙ্গে যুক্ত ইকরামুল হক এবং নব্য জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘বোমারু মামুন’-এর মতো কুখ্যাত উগ্রপন্থীরা জামিনে বেরিয়ে আসার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কপালে ভাঁজ ফেলেছে। বোমা তৈরির কারিগর হিসেবে পরিচিত ‘বোমারু মামুন’ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি সাভার, কেরানীগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ীতে একের পর এক বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে।
সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ও আল-কায়েদা বিতর্ক
গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রেশার কুকার বোমা এবং বিপুল পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধার করে সিটিটিসি। এর আগে আশুলিয়া, মতিঝিল ও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানেও বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার জেরে দেশজুড়ে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এর মাঝেই গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস এখন বড় কোনো ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ‘সেল’-এর মাধ্যমে বিকেন্দ্রীভূতভাবে কাজ করার কৌশল নিয়েছে এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। যদিও এই প্রতিবেদনকে এই মুহূর্তে ‘অনুমাননির্ভর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো তার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে। শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়, নিষিদ্ধঘোষিত অন্যান্য শক্তিগুলোও এই সময়টিকে তাদের বিচরণের মোক্ষম ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিতে পারে। যদিও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, জামিনপ্রাপ্ত ও সন্দেহভাজন জঙ্গিদের প্রতিটি গতিবিধির ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হচ্ছে, তবুও কারামুক্ত বন্দিদের একটি বড় অংশের বর্তমান অবস্থান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা থাকায় উদ্বেগ কাটছে না।