একসঙ্গে ৩১টি বাদ্যযন্ত্র বাজান! এ আর রহমান-বাপি লাহিড়ীকেও হার মানানো এই জাদুকর আজ কেন চরম কান্নায় ভাঙলেন?

এ আর রহমান কিংবা প্রয়াত বাপি লাহিড়ী—বিশ্বখ্যাত এই মিউজিক কম্পোজারদের সুরের মূর্ছনায় বুঁদ হতে শ্রোতারা দেদার অর্থ খরচ করেন। তাঁদের নাম জানেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু যিনি একার হাতে একসঙ্গে ৩১টি ভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিপুণভাবে বাজাতে পারেন, সেই রঞ্জনের নাম ক’জন রেখেছেন? মেদিনীপুরের কোতোয়ালির এক সাধারণ ঘরের সন্তান রঞ্জন জানা আজ কেবল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে মার্কিন মুলুক থেকে ইউরোপ—বিশ্বের কোণায় কোণায় তাঁর বাঁশির সুরে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। কিন্তু এত বড় মাপের একজন শিল্পীর জীবন আজ চরম আক্ষেপ আর বঞ্চনায় ভরা।
তালিম ছাড়া বাঁশির সুরে বিশ্বজয়
মেদিনীপুরের বাড়ুয়া এলাকার রঞ্জন জানার ছোট থেকেই বাদ্যযন্ত্রের প্রতি ছিল অদম্য টান। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তালিম ছাড়াই, কেবল এক মেলায় বাঁশি কিনে নিজে নিজে চর্চা শুরু করেছিলেন তিনি। এরপর স্থানীয় যাত্রাপালা ও নাটকে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রীকে দেখে তাদের নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতে শুরু করেন। এভাবেই কঠোর সাধনার জোরে একে একে ৩১টি বাদ্যযন্ত্র বাজানো আয়ত্ত করে ফেলেন তিনি।
একদিন কিংবদন্তি অভিনেতা রবি ঘোষের সঙ্গে সিনেমায় বাঁশি বাজানোর সুযোগ পান রঞ্জন। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। মুম্বইয়ের কনসার্টে প্রয়াত গায়ক এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম থেকে শুরু করে উস্তাদ আমজাদ আলি খান, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শংকরদয়াল শর্মা, নরেন্দ্র মোদি (তৎকালীন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী) কিংবা বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী—সবার প্রশংস কুড়িয়েছেন এই গুণী শিল্পী। দেশ-বিদেশ থেকে ডাক পেলেই আজও তিনি ছুটে যান সুরের জাদু ছড়াতে।
রাজনীতির বলি হয়ে চাকরি হারানোর বেদনা
শিল্পীর প্রতি সম্মান জানিয়ে তৎকালীন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে শালবনিতে শিশুদের বাঁশি শেখানোর একটি সরকারি চাকরি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজ্য রাজনীতির শিকার হয়ে তাঁকে সেই চাকরি হারাতে হয় বলে অভিযোগ। লোকসভা নির্বাচনের সময় একটি রাজনৈতিক প্রচারের মিছিলে তাঁর গলায় মালা পরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর চাকরি চলে যায় বলে জানান শিল্পী। রাজনীতির এই কোপানলে পড়ে আজ তিনি বঞ্চিত ও ব্যথিত।
মানবতার প্রতীক ও একটি অধরা স্বপ্ন
নিজের কষ্টকে ছাপিয়ে রঞ্জনবাবু বরাবর বেছে নিয়েছেন মানবতার পথ। বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে পাওয়া উপার্জনের বড় একটি অংশ তিনি তুলে দেন এলাকার গরিব মানুষের হাতে। কখনো অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা, কখনো আবার গরিব মেয়ের বিয়ে বা পড়াশোনার খরচ জুগিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন স্থানীয় মানুষের মুশকিল আসান।
তবে এতকিছুর পরেও তাঁর মনে রয়ে গিয়েছে এক গভীর ও বড় আক্ষেপ। তাঁর ছোট ঘরে ৩১টি মূল্যবান বাদ্যযন্ত্র ঠিকমতো সাজিয়ে রাখার জায়গা নেই। যত্নের অভাবে সাধের যন্ত্রগুলিতে পড়তে শুরু করেছে মরচে। শিল্পীর শেষ বয়সে তাঁর একটাই আর্জি, তাঁর এই বিশাল সংগ্রহকে বাঁচিয়ে রাখতে যদি একটি মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালা তৈরি করা যেত, তবে হয়তো তাঁর শিল্পীসত্তা পূর্ণতা পেত।