ভুল হাতে পড়লেই প্রলয়ঙ্করী অস্ত্র বানাতে পারে এআই! অ্যানথ্রোপিকের চাঞ্চল্যকর ঝুঁকিপূর্ণ রিপোর্টে কপালে হাত বিজ্ঞানীদের

বর্তমান যুগে ইমেল লেখা, কোডিং থেকে শুরু করে যে কোনো জটিল প্রশ্নের সমাধান নিমেষে করে দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যদি একবার ভুল মানুষের হাতে পড়ে, তবে তা মানবজাতির জন্য এক মারাত্মক ও ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি জনপ্রিয় ‘ক্লাউড’ (Claude) এআই ডেভেলপার সংস্থা ‘অ্যানথ্রোপিক’ (Anthropic) তাদের সর্বশেষ ঝুঁকি প্রতিবেদনে এই ধরনের বেশ কয়েকটি গুরুতর হুমকি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির স্পষ্ট দাবি, আরও বেশি সক্ষম ও উন্নত এআই মডেলগুলো কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এমন ব্যক্তিদেরও জৈবিক বা রাসায়নিক অস্ত্র তৈরিতে সাহায্য করতে পারে, যাদের এই বিষয়ে ন্যূনতম কোনো পূর্বজ্ঞাত দক্ষতা নেই।
এছাড়াও, এআই-এর স্বাধীনভাবে গবেষণা করার ক্ষমতা, এর অপ্রত্যাশিত আচরণ এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে।
১. মারাত্মক অস্ত্র তৈরিতে সহায়তার বিপদ
অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে জৈবিক ও রাসায়নিক অস্ত্রের অপব্যবহার। কোম্পানিটির মতে, তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেলগুলো এমন কিছু ব্যক্তিদের দক্ষতা বা ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে পারে, যাঁদের কাছে বিপজ্জনক অস্ত্র তৈরির মতো উপযুক্ত সংস্থান বা প্রযুক্তিগত জ্ঞান নেই। অর্থাৎ, এআই যদি কোনোভাবে সঠিক তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জুগিয়ে দেয়, তবে সাধারণ মানুষও বড় ধরনের ধ্বংসলীলা চালানোর হাতিয়ার পেয়ে যেতে পারে। এই সম্ভাব্য বিপদকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে সংস্থাটি এবং তাদের মডেলগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও ফিল্টার ব্যবস্থা জোরদার করার কাজ শুরু হয়েছে।
২. নিজের এআই নিজে তৈরি করার দৌড়
এআই প্রযুক্তি নিয়ে দ্বিতীয় বড় উদ্বেগটি জড়িয়ে রয়েছে গবেষণা ও কোডিংয়ের সঙ্গে। অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, তাদের প্রোডাকশন সিস্টেমে ব্যবহৃত কোডের একটি বিরাট অংশ এখন এই ক্লাউড প্রযুক্তির মাধ্যমেই লেখা হচ্ছে। যদিও এটি কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তবুও বিশেষজ্ঞদের মনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই নিজের চেয়েও বেশি শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক মডেল তৈরির জন্য গবেষণার কাজ দ্রুতগতিতে চালিয়ে যায়, তবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের গতি মানুষের পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে চিরতরে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
৩. ক্ষতিকর আচরণ ও সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি
অ্যানথ্রোপিক তাদের এআই মডেলগুলোর আচরণগত পরীক্ষার ফলাফলও প্রকাশ্যে এনেছে। কোম্পানিটির মতে, বর্তমান মডেলগুলো সাধারণত সরাসরি মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করার বা ক্ষতিকারক মনোভাব দেখায় না। তবে কিছু বিশেষ পরীক্ষায় দেখা গেছে, কোনো কঠিন লক্ষ্য বা টার্গেট অর্জনের জন্য এই মডেলগুলি অনেক সময় পূর্বনির্ধারিত নিয়ম বা নীতি থেকে বিচ্যুত হতে কিংবা ভুল পথ বেছে নিতে কিছুটা হলেও ইচ্ছুক। এই পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা ঝুঁকির মাত্রা ‘অত্যন্ত নিম্ন’ থেকে বাড়িয়ে ‘নিম্ন’ স্তরে উন্নীত করেছেন।
এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তাও এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যানথ্রোপিকের মতে, এআই মডেলগুলো যে গতিতে উন্নত হচ্ছে, সেগুলোকে সুরক্ষিত বা হ্যাকিং-মুক্ত করার ব্যবস্থা সেই একই গতিতে শক্তিশালী হচ্ছে না। ফলস্বরূপ, এই শক্তিশালী মডেলগুলো সাইবার অপরাধী ও হ্যাকারদের কাছে অত্যন্ত লোভনীয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে, অত্যন্ত দক্ষ অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি কিংবা শক্তিশালী কোনো দেশের মদতপুষ্ট সাইবার হানার আশঙ্কাকে একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ধরনের ভয়াবহ হুমকি মোকাবিলা করার জন্য আগামী দিনে বিপুল বিনিয়োগ, কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং নিরন্তর পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।