ফাঁসির দড়ির দিন কি তবে শেষ? মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বড় মোড়!

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে ফাঁসির পরিবর্তে প্রাণঘাতী ইনজেকশন বা অন্য কোনো “কম যন্ত্রণাদায়ক” পদ্ধতি চালুর সমস্ত আর্জি খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সাংবিধানিক বৈধতা পুরোপুরি বহাল রেখে দেশের শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আপাতত দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসিই বলবৎ থাকছে।
বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ এই আবেদনটি খারিজ করে দেয়। সেই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে এমন কোনো বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছিল যাতে দোষী ব্যক্তির শারীরিক যন্ত্রণা কমবে এবং তার মর্যাদাও রক্ষা পাবে। পাশাপাশি, এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের তিনটি রায় পুনর্বিবেচনার জন্য বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর যে আবেদন করা হয়েছিল, আদালত তাও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আবেদনে ঠিক কী বলা হয়েছিল?
আইনজীবী ঋষি মালহোত্রার দায়ের করা এই জনস্বার্থমূলক মামলায় ফাঁসির বিকল্প হিসেবে প্রাণঘাতী ইনজেকশন, ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করা, বৈদ্যুতিক শক বা গ্যাস চেম্বারের মতো আধুনিক পদ্ধতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আবেদনকারীর দাবি ছিল, এই সমস্ত পদ্ধতিতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করা সম্ভব।
মামলায় ফাঁসিকে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অমানবিক ও নিষ্ঠুর হিসেবে অভিহিত করা হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫৪(৫) ধারার অধীনে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধানটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পাশাপাশি সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় ‘মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুর অধিকার’-কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ফাঁসি দেওয়ার পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগে, অথচ গুলি করা বা প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র পাঁচ মিনিটেই সম্পন্ন করা সম্ভব। শুনানিতে রাষ্ট্রসংঘের একটি প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরা হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে মৃত্যুদণ্ড এমনভাবে কার্যকর করা উচিত যাতে ন্যূনতম শারীরিক যন্ত্রণা হয়।
‘বিকল্প পদ্ধতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্র স্বাধীন’
সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়েছে যে, এই বিষয়ে তাদের বর্তমান রায়ই শেষ কথা নয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিকল্প পদ্ধতি সম্পর্কে যদি ভবিষ্যতে জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখা যেতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, বর্তমান রিট পিটিশন খারিজ হওয়ার অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতের জন্য সাংবিধানিক পর্যালোচনার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। যদি এমন কোনো জোরালো বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাগত বা অভিজ্ঞালব্ধ প্রমাণ সামনে আসে, যা দেখায় যে সময়ের সঙ্গে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলোর ভিত্তি পরিবর্তিত হয়েছে, তবে বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা যেতে পারে।
পাশাপাশি আদালত এও জানিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিকল্প পদ্ধতিগুলোর বিষয়ে সামগ্রিক পর্যালোচনা করার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে পারে। উল্লেখ্য, গত ২২ জানুয়ারি এই মামলার শুনানি শেষ করে রায় স্থগিত রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট।
কেন্দ্রের অবস্থান ও আদালতের পূর্ববর্তী অসন্তোষ
মামলার শুনানিকালে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে উপস্থিত অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি এর আগে আদালতকে জানিয়েছিলেন যে, সরকার এই বিষয়টি বিবেচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। তবে এর আগে ১৫ অক্টোবর, ২০২৫-এর শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছিল যে, কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রথা বা পদ্ধতি পরিবর্তনে খুব একটা ইচ্ছুক নয়।
শুনানির সময় এমনকি এমন একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল যে, দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ফাঁসি নাকি প্রাণঘাতী ইনজেকশন—এই দুটির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু কেন্দ্র তার হলফনামায় সাফ জানিয়ে দেয় যে এমন বিকল্প দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তখন বেঞ্চ মৌখিকভাবে মন্তব্য করেছিল যে, সমস্যা হলো সরকার পরিবর্তন আনতে ইচ্ছুক নয়। আদালত আরও বলেছিল যে এটি একটি অত্যন্ত পুরনো পদ্ধতি এবং সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে।