মিড-ডে মিলে বিরাট ধামাকা! রান্নার গ্যাসের পরিকাঠামো থেকে রন্ধনকর্মীদের ভাতা বৃদ্ধি, খুশির হাওয়া রাজ্যে

মিড-ডে মিল ব্যবস্থাকে আরও বেশি সুসংগঠিত, আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে একযোগে একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। রান্নার জ্বালানি, রন্ধনকর্মীদের মাসিক ভাতা এবং পড়ুয়াদের খাবার তৈরির খরচ—এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রেই বরাদ্দ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্য স্কুল শিক্ষা দফতরের তরফে এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি হওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক চর্চা।
রান্নার গ্যাসে শতভাগ মুড়ে ফেলার উদ্যোগ
স্কুল শিক্ষা দফতর সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, কলকাতাকে বাদ দিয়ে রাজ্যের কার্যত ১০০ শতাংশ স্কুলেই এবার থেকে রান্নার গ্যাসের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে প্রায় ৮ হাজার ৩৩৫টি এমন স্কুল রয়েছে, যেখানে রান্নার গ্যাসের সংযোগ নেই। এতদিন ওই স্কুলগুলিতে বিকল্প জ্বালানি কিংবা সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে মিড-ডে মিল রান্না করা হতো।
এবার সেই পুরনো ব্যবস্থার চিরতরে অবসান ঘটাতে চলেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলিতে এলপিজি (LPG) সেট আপ এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির জন্য প্রতিটি স্কুলকে ৩০০০ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ দফতরের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর সমস্ত জেলাশাসক ও শিক্ষা আধিকারিকদের কাছে এই মর্মে কড়া নির্দেশিকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রন্ধনকর্মীদের ভাতায় বাম্পার বৃদ্ধি
শুধু রান্নার জ্বালানিই নয়, মিড-ডে মিলের রান্নার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত কুক-কাম-হেল্পারদের (Cook-cum-Helper) মাসিক ভাতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতদিন তাঁরা বছরে সর্বোচ্চ ১০ মাসের জন্য প্রতি মাসে ২০০০ টাকা করে পেতেন। এই ২০০০ টাকার মধ্যে কেন্দ্রের অংশ ছিল ৬০০ টাকা, রাজ্যের নির্ধারিত অংশ ছিল ৪০০ টাকা এবং রাজ্য সরকারের অতিরিক্ত সহায়তা ছিল ১০০০ টাকা।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই অতিরিক্ত সহায়তা আরও ১০০০ টাকা বাড়িয়ে সরাসরি ২০০০ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে রন্ধনকর্মীদের মোট মাসিক ভাতা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩০০০ টাকা। চলতি বছরের অগস্ট মাস থেকেই এই বর্ধিত অর্থ কার্যকর করা হয়েছে। এর জেরে রাজ্যজুড়ে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৩৮ জন রন্ধনকর্মী সরাসরি উপকৃত হবেন।
পড়ুয়াদের খাবার তৈরিতে শিশুপিছু বরাদ্দ বৃদ্ধি
মিড-ডে মিলের গুণগত মান উন্নত করতে রান্নার জন্য শিশুপিছু দৈনিক বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। সরকারি, সাহায্যপ্রাপ্ত এবং পোষিত প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক অর্থাৎ ‘বাল-বাটিকা’ স্কুলগুলিতে এতদিন রান্না করা খাবারের জন্য প্রতি পড়ুয়া পিছু দৈনিক বরাদ্দ ছিল ৬.৭৮ টাকা।
এবার সেই বরাদ্দের সঙ্গে রাজ্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে আরও ৩.২২ টাকা যোগ করা হয়েছে। ফলে গত ১ অগস্ট থেকে প্রাথমিক স্তরে প্রতিটি শিশুর জন্য খাবার তৈরির খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ঠিক ১০ টাকা। উল্লেখ্য, রাজ্যের নতুন সরকারের প্রথম বাজেটেই প্রাথমিক স্তরে মিড-ডে মিলের এই বরাদ্দ ও ভাতা বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন হিসেবেই এখন দফতরের তরফে এই নির্দেশিকা কার্যকর করা হলো।
কলকাতাকে কেন আপাতত এই নির্দেশের বাইরে রাখা হলো?
রাজ্যের বাকি জেলাগুলিতে গ্যাসের শতভাগ সংযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হলেও, এই মুহূর্তে কলকাতার স্কুলগুলিকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। স্কুল শিক্ষা দফতরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শহর কলকাতায় মিড-ডে মিল সরবরাহের পরিকাঠামো অনেকটাই আলাদা। কলকাতার বেশ কয়েকটি স্কুলে ইসকন (ISKCON)-এর মাধ্যমে এবং অন্যান্য কিছু স্কুলে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে রান্না করা খাবার সরাসরি সরবরাহ করা হয়। ফলে ওই স্কুলগুলির নিজস্ব চত্বরে আলাদা করে রান্না করার প্রয়োজন হয় না। তবে আগামী দিনে ওই সমস্ত হাসপাতালেও যাতে নিজস্ব ব্যবস্থায় ডিম সিদ্ধ বা সামান্য রান্নার জন্য গ্যাস সংযোগ বা ইলেকট্রিক হিটার বসানো যায়, সে বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।
সবমিলিয়ে, রান্নার জ্বালানির আধুনিকীকরণ, রন্ধনকর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা এবং শিশুদের খাবারের মানোন্নয়ন—এই তিনের মেলবন্ধনে রাজ্যের মিড-ডে মিল ব্যবস্থায় এক বিশাল ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চলেছে রাজ্য সরকার।