কিবোর্ডের অক্ষরগুলো কেন এমন এলোমেলো সাজানো থাকে? আসল কারণ জানলে চমকে উঠবেন!

স্মার্টফোনে দ্রুত মেসেজ পাঠানো হোক কিংবা কম্পিউটারে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ— কিবোর্ডের ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কিবোর্ডের দিকে তাকালে প্রায় সবার মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে— বর্ণমালার সহজ ক্রম ‘A, B, C, D’ মেনে না লিখে কেন ‘Q, W, E, R, T, Y’ দিয়ে কিবোর্ড শুরু হয়? কেনই বা ইংরেজি বর্ণগুলো এভাবে এলোমেলোভাবে সাজানো থাকে? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এক মেকানিক্যাল ইতিহাস এবং মানুষের অভ্যাসের অদ্ভুত বিজ্ঞান।
টাইপরাইটারের যান্ত্রিক ত্রুটি ও সমাধান
১৮৬৮ সালে মার্কিন উদ্ভাবক ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলেস (Christopher Latham Sholes) যখন প্রথম বাণিজ্যিক টাইপরাইটার আবিষ্কার করেন, তখন এর কিবোর্ডটি ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমেই (A, B, C, D…) সাজানো ছিল। কিন্তু এই লেআউটেই প্রথম বিপত্তি দেখা দেয়। সেকালের টাইপরাইটারে প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে একটি করে ধাতব হাত বা ‘টাইপ বার’ যুক্ত থাকত। কোনো কি (Key) চাপলে সেই ধাতব বারটি গিয়ে কাগজের ওপর কালির ফিতেয় আঘাত করত এবং অক্ষরটি ছাপা হতো।
যখন টাইপিস্টরা পরপর দ্রুত টাইপ করতেন, তখন পাশাপাশি থাকা বর্ণগুলোর ধাতব বারগুলো একে অপরের সঙ্গে আটকে বা ‘জ্যাম’ হয়ে যেত। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় যেসব অক্ষর পাশাপাশি বেশি ব্যবহৃত হয় (যেমন— TH, ST, ER, IN), সেগুলোর মেটাল বার বারবার জ্যাম হয়ে যন্ত্রটিকে অচল করে দিত।
এই যান্ত্রিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলেস এবং তাঁর সহযোগীরা বেশ কয়েক বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। অবশেষে ১৮৭৩ সালে তিনি আজকের বিখ্যাত ‘QWERTY’ কিবোর্ড লেআউট তৈরি করেন। এই নতুন নকশার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি— প্রথমত, বেশি ব্যবহৃত অক্ষরের জোড়াগুলোকে কিবোর্ডে দূরত্বে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে তাদের ধাতব বারগুলো একসঙ্গে উঠে জ্যাম তৈরি করতে না পারে। দ্বিতীয়ত, দুই হাতের আঙুলের মধ্যে কাজের ভারসাম্য তৈরি করা, যাতে টাইপিং আরও মসৃণ ও দ্রুত হয়। পরবর্তীতে ‘রেমিংটন’ (Remington) কোম্পানি এই কিবোর্ড ডিজাইনটি কিনে নেয় এবং তা দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে টাইপরাইটার উৎপাদন শুরু করে।
ডিজিটাল যুগেও কেন বদলাল না এই লেআউট?
আজকের আধুনিক কম্পিউটার কিবোর্ড কিংবা স্মার্টফোনের টাচস্ক্রিনে কোনো ধাতব বার বা মেকানিক্যাল যন্ত্রাংশ নেই, ফলে টাইপ করার সময় জ্যাম হওয়ারও কোনো আশঙ্কা নেই। চাইলে প্রযুক্তিগতভাবে আমরা সহজেই বর্ণমালার স্বাভাবিক ক্রমে (A, B, C, D) ফিরে যেতে পারতাম। তা সত্ত্বেও কেন কিউডব্লিউইআরটিওয়াই (QWERTY)-ই বিশ্বজুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে চলেছে?
এর আসল উত্তর হলো ‘মাসল মেমোরি’ (Muscle Memory) বা মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বিংশ শতাব্দীর সূচনাতেই বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পেশাদার কর্মী ও টাইপিস্ট QWERTY লেআউটে টাইপ করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে যখন কম্পিউটার বা মোবাইল স্ক্রিন এল, তখন নতুন কোনো লেআউট বাজারে আনলে কোটি কোটি মানুষকে পুনরায় নতুন করে টাইপিং শেখাতে হতো, যা বাণিজ্যিকভাবে বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারত।
পরবর্তীকালে টাইপিংয়ের গতি আরও বাড়ানোর জন্য ‘ডভোরাক’ (Dvorak Simplified Keyboard)-এর মতো অনেক বেশি কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক কিবোর্ড লেআউট আবিষ্কার হলেও, মানুষের পুরনো অভ্যাসের কাছে তা শেষ পর্যন্ত হেরে যায়। ফলে টাইপরাইটারের জ্যাম এড়াতে তৈরি হওয়া ১৮৭৩ সালের সেই ঐতিহাসিক নকশাই আজ আধুনিক স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের পর্দার রাজত্ব করে চলেছে।