তিব্বতে চীনের মেগা ড্যাম প্রকল্প! ভারতের উদ্বেগের কারণ কী? জানলে চমকে যাবেন

তিব্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতে প্রবেশ করে বাংলাদেশে প্রবাহিত হওয়া একটি trans-boundary (সীমান্তবর্তী) নদী নিয়ে চীনের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ডেটা বা তথ্য চেয়েছে ভারত। কিন্তু হঠাৎ এই ডেটার কেন প্রয়োজন পড়ল? আর এই পুরো ঘটনার নেপথ্যেই বা আসল কারণ কী? চলুন বিষয়টি বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

মূল সমস্যাটি কোথায়?
চীনের আপস্ট্রিমে বা নদীটির উচ্চ অববাহিকায় একটি বিশাল আকenর hydropower বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে চীন। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হওয়া ভারত-চীন ওয়ার্কিং মেকানিজম ফর কনসালটেশন অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশনের (WMCC) বৈঠকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা আদান-প্রদান পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে এবং চীনের আপস্ট্রিম হাইড্রো পাওয়ার প্রকল্পগুলো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।

নদীটির ভৌগোলিক প্রবাহ এবং পরিচয়
নদীর নাম বিভিন্ন দেশে ভিন্ন:

তিব্বত (চীন): ইয়ারলুং সাংপো (Yarlung Tsangpo)

ভারত (অরুণাচল প্রদেশ): সিয়াং (Siang)

ভারত ও বাংলাদেশ (আসাম হয়ে): ব্রহ্মপুত্র (Brahmaputra)

তিনটি দেশজুড়ে বিস্তৃত এই নদীটি চীনের একক সম্পত্তি নয়, বরং একটি যৌথ নদী। আর এখানেই চীনের বড় পরিকল্পনা নিয়ে ভারতের প্রধান উদ্বেগ।

চীন ঠিক কী তৈরি করছে?
চীনের পক্ষ থেকে ইয়ারলুং সাংপোর নিম্ন অববাহিকায়, ভারতের অরুণাচল প্রদেশের খুব কাছেই একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে।

প্রকল্পের ক্ষমতা: এই ড্যামটির পরিকল্পিত ক্ষমতা প্রায় ৬০,০০০ মেগাওয়াট।

বিশ্বের বৃহত্তম: ইনস্টলড ক্যাপাসিটির দিক থেকে এটি থ্রি জর্জেস ড্যামকেও (Three Gorges Dam) ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম হাইড্রো পাওয়ার ফ্যাসিলিটিতে পরিণত হতে পারে।

হিমালয় পর্বতমালা কেটে নদীটি প্রচণ্ড বেগে নিচে নামার কারণে সেখানে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। বেইজিং এটিকে তাদের পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং জলবিদ্যুৎ কৌশলের অংশ বলে দাবি করলেও, নদীর ঠিক ওপরের অংশ নিয়ন্ত্রণকারী কোনো দেশ যখন এত বড় মেগা প্রকল্প হাতে নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই নিচের অববাহিকার দেশগুলোর মনে নানা প্রশ্ন ও আশঙ্কার জন্ম হয়।

ভারত ও চীনের মধ্যকার পূর্বের ডেটা শেয়ারিং চুক্তি এবং বর্তমান সমস্যা
অতীতে ভারত ও চীনের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য আদান-প্রদানের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল। যার মাধ্যমে বর্ষাকালে আপস্ট্রিমের মনিটরিং স্টেশনগুলোর তথ্য ভারতকে দিত চীন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল:

নদীর জলস্তর হঠাৎ বাড়লে ভারতের নিম্নাঞ্চলের কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই সতর্ক করা।

বন্যা পূর্বাভাস এবং সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখা।

কিন্তু ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনার পর থেকে সেই তথ্য আদান-প্রদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। চীন থেকে নিয়মিত ডেটা পাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর ওপর চীনের মেগা-ড্যাম প্রকল্প যুক্ত হওয়ায় ভারত এখন কেবল নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নয়, বরং আপস্ট্রিমে তৈরি হওয়া অবকাঠামোর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কেও জানতে চাইছে।

এই ডেটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্তুতি: তিব্বতে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে জলস্তর বাড়লে সময়মতো তথ্য পেলে ভারতের নিম্নাঞ্চলের কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়। তথ্য না পেলে বা দেরিতে পেলে চরম বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা থাকে।

পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি: হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম সংবেদনশীল এবং ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। বড় বাঁধের কারণে নদীর পলিপ্রবাহ, বাস্তুতন্ত্র, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। অতীতে ২০১৭ সালে সিয়াং নদীর জল কালো হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছিল আপস্ট্রিমের অজানা কার্যক্রম।

কৌশলগত সুবিধা (Strategic Concern): নদীর আপস্ট্রিম চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ভারতের কাছে তার পূর্ণ দৃশ্যমানতা (Visibility) নেই।

ভারত এখন ঠিক কী চাইছে?
নতুন দিল্লি মূলত স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং একটি কার্যকর সংলাপের মাধ্যম চাচ্ছে। নদীটি যখন একাধিক দেশের সীমান্ত পার হয়, তখন নদীর জলের পাশাপাশি নদীর তথ্য বা ডেটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—এটাই এখন ভারতের মূল বক্তব্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *